বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে স্বতন্ত্র কণ্ঠধারার এক সংগীতশিল্পী সালমা আক্তার। ছোটবেলা থেকেই সুর আর তালের সঙ্গে এক অদ্ভুত সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন তিনি। বিভিন্ন ঘরানার গান গেয়ে শ্রোতাদের হৃদয়েও এরই মধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন। তার প্রতিটি গানেই লুকিয়ে থাকে আবেগ ও জীবনের গল্প। সংগীতের শুরু, সাম্প্রতিক সংগীত ও ভবিষ্যৎ গান নিয়ে তার সঙ্গে আলাপের ভিত্তিতে লিখেছেন অহিদুর রহমান
শৈশবেই গানের যাত্রা
ছোটবেলা থেকেই গান ছিল কণ্ঠশিল্পী সালমা আক্তারের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কুষ্টিয়ার গ্রামে জন্ম নেয়া সালমার পরিবারেই তার সংগীত ভালোবাসার প্রথম বীজ বোনা। শুরুতেই সালমা তার সংগীতজীবন শুরুর কথা স্মরণ করলেন, তার কাকা গান করতেন। এছাড়া ছোটবেলা থেকেই তিনি লালন শাহর গান শুনতে শুনতে গান ও সুরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠেন। চার বছর বয়সে তার বড় ভাই নাহারুল ইসলাম তাকে গুরুজি ওস্তাদ শফি মণ্ডলের কাছে নিয়ে যান। সালমা বলেন, ‘ওস্তাদ শফি মণ্ডলের কাছেই আমার গানের হাতেখড়ি। পাঁচ-ছয় বছর ধরে ক্ল্যাসিক্যাল প্রশিক্ষণ নেয়ার পর আমার সংগীত যাত্রা দৃঢ়তার সঙ্গে এগোতে শুরু করে।’
ক্যারিয়ারের সূচনা
সালমার প্রকাশ্য সংগীতজীবনের মোড় আসে ক্লোজআপ ওয়ান প্রতিযোগিতা থেকে। এ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তিনি দেশের মানুষের কাছে তার কণ্ঠের মাধুর্য উপস্থাপন করার সুযোগ পান। সালমা জানান, তার বাবা সবসময় চেয়েছিলেন তিনি যেন গান করেন। এছাড়া তার পরিবারের প্রত্যেক সদস্য কাকা, মামা, ভাই তারাও সবসময় তাকে উৎসাহ দিয়েছেন। ছোটবেলায় টুকটাক গান করলেও পরিবারের প্রশংসা ও উৎসাহই তাকে আরো ভালোভাবে গান শেখার জন্য অনুপ্রাণিত করেছে।
সালমা বলেন, ‘আমার পরিবারের সমর্থন ও দেশের মানুষের ভালোবাসা আমার জন্য সবসময় বড় প্রেরণা হয়ে কাজ করেছে। তারা আমাকে প্রতিনিয়ত উৎসাহ দিয়েছে, যার জন্য আমি সবার প্রতি চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব। পরিবার ও দেশের মানুষের এ সমর্থনই আমাকে সংগীতের জগতে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।’
সিনেমায় প্রবেশ ও খ্যাতি
সালমা আক্তারের সিনেমায় প্রথম গান হলো ‘এক নয়ন’, যা প্রকাশ পায় গাংচিল ব্যানারের মাধ্যমে। এ গান তাকে চলচ্চিত্র পর্দার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি দর্শক ও ভক্তদের কাছে পরিচিতি এনে দেয়। এরপর তিনি আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ও ইমন শাহর সঙ্গে বহু প্লেব্যাক গান করেন।
দীর্ঘদিন পর সিনেমার গানে
অনেক বছর পর আবারো সিনেমায় গান করার সুযোগ পান সালমা, সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘নন্দিনী’ সিনেমায় তার একটি গান রয়েছে, যা শ্রোতাদের মধ্যে প্রশংসিত হয়। সালমা বলেন ‘বেশ বিরতির পর চলচ্চিত্রে আমার গাওয়া কোনো গান প্রকাশ পেয়েছে। গানটি গেয়েছিলাম অনেক আগে। এটি শুনে মানুষ ভালো বলছেন। যারা শুনেছেন, তারা বলেছেন অনেক দিন পর একটি ভালো গান শুনলাম। আমার সমসাময়িক অনেক শিল্পীই সিনেমায় গান করছেন। সবাই বলছেন, গানটি ভালো হয়েছে। অনেক দিন পর এ সিনেমার গান আমাকে নতুন অভিজ্ঞতা দিয়েছে। মানুষ আমার গানের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়েছে, যা আমার জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। প্রতিটি গান আমার জন্য নতুন শিক্ষা, নতুন উদ্দীপনা।’
বর্তমান কাজ
বর্তমানে সালমা তার নিজস্ব মিউজিক চ্যানেলের মাধ্যমে মাঝে মধ্যে শ্রোতাদের জন্য নতুন গান উপহার দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘মাঝখানে বেশকিছু সময় ব্যবসার ব্যস্ততার কারণে গানকে পুরোপুরি সময় দিতে পারিনি। এখন আমি গানের প্রতি আরো গুরুত্ব দিচ্ছি এবং চেষ্টা করছি শ্রোতাদের কাছে ভালো কিছু উপহার দিতে।’ তিনি আশা করেন, ভক্তরা তার নতুন গানগুলো ভালোবেসে গ্রহণ করবেন এবং তাদের ভালোবাসাই তাকে নতুন শক্তি দেবে।
ভবিষ্যতের লক্ষ্য ও মানবিক কাজ
সংগীত জীবনের পাশাপাশি মানবিক কাজের ক্ষেত্রেও সালমার আগ্রহ প্রবল। তিনি চান মানুষ তাকে কেবল একজন শিল্পী হিসেবে নয়, বরং একজন মানবিক মানুষ হিসেবে মনে রাখুক। তার স্বপ্ন এতিম ও পথশিশুদের পাশে দাঁড়ানো, প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সহায়তা করা। সালমা মনে করেন, একজন শিল্পীর শুধু জনপ্রিয়তা বা সাফল্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, মানবিক দায়িত্ব পালন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘আমার সংগীত আমার পেশা, কিন্তু মানুষের পাশে থাকা, সমাজের জন্য কিছু করা আমাকে আরো আনন্দ দেয়। আমি চাই আমার গান ও মানবিক কাজ দুটোই মানুষের মনে জায়গা করে নিক।’










