একুশে পদকপ্রাপ্ত গুণী অভিনয়শিল্পী দিলারা জামান। ৮১ বছর বয়সেও ক্লান্তিহীন কাজ করে চলছেন। প্রায় ছয় দশক ধরে বড় ও ছোট পর্দা দুই মাধ্যমেই অভিনয় করে যাচ্ছেন। সামনে কাজ করে যাবেন অবিরাম এ প্রত্যাশাই করলেন। সম্প্রতি যুক্ত হয়েছেন ‘সবুজ গ্রাম পাথরের শহর’ নামক একটি ধারাবাহিকে। তার কাজ ক্যারিয়ার ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান।

সবুজ গ্রাম পাথরের শহর নামে একটি নাটকে কাজ করছেন, এটি সম্পর্কে যদি বলতেন।

এটা একটা ধারাবাহিক নাটক। নাটকটি বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে নির্মিত। এটি বৈশাখী টিভিতে দেখা যাবে।

প্রেম দেওয়ানা নামে আরেকটি নাটকে কাজ করেছেন শুনেছি, সেখানে আপনাকে কী চরিত্রে দেখা যাবে?

অনেক দিন আগে এ নাটকে অভিনয় করেছি। গল্পটা ঠিকঠাক পুরোপুরি মনে নেই। তবে এটুকু মনে আছে কমেডি ঘরানার একটি নাটক এটি। গল্পটা ভালো। নির্মাতাও যত্ন নিয়ে কাজটি করেছিলেন। নাটকটিতে দর্শক প্রথমে আমাকে ভুল বুঝবে, খারাপ মনে করবে, শেষের দিকে দর্শকের খারাপ ধারণা কেটে যাবে। নাটকটি কোথায় মুক্তি দেয়া হবে, এটা আমি কিছুই বলতে পারছি না।

অভিনয়ের সঙ্গেই ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিলেন। এ জার্নির শুরুটা নিয়ে যদি বলতেন...

অভিনয়কে ভালোবেসে এসেছিলাম। আমি যখন থেকে অভিনয় শুরু করি, তখন মুসলিম মেয়েরা সংস্কৃতির দিকে আসতে পারত না। সে সময়ে আমি কাজ করতে এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন শহীদ মুনীর চৌধুরী স্যার, ড. নীলিমা ইব্রাহিম তাদের ছাত্রী ছিলাম আমি। এছাড়া এমন বহু প্রাজ্ঞজনের সঙ্গে মিশেছি। আমি বাংলা বিভাগ নিয়ে পড়তাম। ডাকসুর নাটক করেছি। তখন কার্জন হলে নাটক হতো, আব্দুল্লাহ আল মামুন, ড. এনাম তারা তৎকালীন সময়ে ডাকসুর নাটকে ছিলেন।

ড. শহীদ মুনীর চৌধুরী আমার বাবাকে চিঠি লিখেছেন আপনার মেয়ে আমাদের সঙ্গে কাজ করবে, আব্বাও অনুমতি দিলেন, এভাবেই কাজের শুরু।

আপনার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের সঙ্গে বর্তমান কাজের কেমন পার্থক্য দেখছেন?

অনেক পরিবর্তন হয়েছে। যখন আমার টেলিভিশনে যাত্রা শুরু হয়, তখন মঞ্চের মতো সরাসরি প্রচার হতো। তখন ব্যাপারটা অনেক কঠিন ছিল। সংলাপ একদম মুখস্ত রাখতে হতো এবং একটা ভুলে গেলে অসুবিধা। আবার ক্যামেরাও ফিক্সড থাকত। সেহেতু এক পা বাইরে গেলে সমস্যা হতো। এ অবস্থার ভেতর দিয়ে আমরা কাজ করেছি এবং শিখেছি। তখনকার কথা তুলনা করলে এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে, অনেক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, প্রযুক্তির অনেক উন্নতি হয়েছে।

অভিনয়ের ক্যারিয়ারে আপনার প্রাপ্তি কতটুকু?

দর্শকের ভালোবাসা ও মানুষের কাছাকাছি যেতে পারাটাই মনে করি বড় প্রাপ্তি বা সার্থকতা। প্রতিটা চরিত্র যদি দর্শক বাস্তব সত্যি মনে করে নিজের মনের মধ্যে গেঁথে নেয়, সেখানেই আমি মনে করি কাজের সার্থকতা। মানুষ যাতে আমার অবর্তমানে আমাকে মনে রাখে এ চেষ্টাই করছি। কাজের প্রতি সবসময় সৎ ও একনিষ্ঠ থাকার চেষ্টা করেছি। এখন দর্শক আমাকে কতখানি নেবে এবং আগামী দিনে কতখানি মনে রাখবে এটা তাদের ওপরে।

ক্যারিয়ারে অপ্রাপ্তি কিছু আছে?

আমার ক্যারিয়ারে অপ্রাপ্তি বলে কিছু নেই। এ জীবনে যা চেয়েছি সবই পেয়েছি।

নতুনদের উদ্দেশে আপনার কী নির্দেশনা?

অভিনয়কে একসময় পেশা হিসেবে নেয়া যেত না। বুলবুল ভাই, হাসান ইমাম ভাই তারা সবাই অন্য চাকরির পাশাপাশি অভিনয় করেছেন। এখন অভিনয়কে মানুষ সম্মানের সঙ্গে পেশা হিসেবে নেয়। অভিনয় শেখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শাখা ও বিভাগ হয়েছে। যারা নতুন কাজ করছে তাদের উদ্দেশে বলব, এলাম আর কিছু অর্থের বিনিময়ে অভিনয় করলাম তা যেন না হয়। অভিনয়টাকে ভালোবাসার পাশাপাশি এটার প্রতি সৎ থাকতে হবে। সবাইকে বলি, তোমরা কাজ করে—কী পেলাম না পেলাম পরের কথা, কিন্তু তুমি যে কাজটা করছ একনিষ্ঠ থাকো, তাহলে কাজটাই তোমাকে অনেক এগিয়ে নেবে। পাশাপাশি কাজটাকে শিখে আসতে হবে। অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেয়ার পর দক্ষতাও অর্জন করতে হবে। যেকোনো পেশাতেই দক্ষতা ছাড়া ভালো করা সম্ভব না।

আপনার এ অবস্থানে আসার পেছনে কাদের ক্রেডিট দিতে চান?

আমার এ অবস্থানে আসার পেছনে আমার পরিবারের অনেক আত্মত্যাগ আছে। আমি যখন শুরুতে কাজ করেছি, তখন কাজ শেষ করে বাসায় ফিরতে অনেক সময় ভোররাত হয়ে যেত। তখন দেখতাম আমার স্বামী বসে লেখালেখি করছেন। বেল দিতাম না যদি বাচ্চারা উঠে যায়। আমার স্বামী যখন বাসার নিচে গাড়ি দেখতেন, তখনই দরজা খুলে বসে থাকতেন। গোসল করে নামাজ পড়ে যখন শুয়ে পড়েছি, এরপর আবার সকালে ডেকে দিতেন। এভাবেই আমার স্বামী আমার পাশে ছিলেন। তখন মোবাইল ছিল না, এমন জায়গায় গেছি, যেখানে টেলিফোনও নেই যে বাসায় ফোন করব। যখন বের হয়েছি, দেখেছি মেয়েরা ঘুমিয়ে আছে, আবার যখন বাসায় ফিরেছি, তখনো দেখেছি তারা ঘুমিয়ে আছে। এমন হয়েছে যে তাদের সঙ্গে কয়েকদিন কোনো কথা হয়নি। কিন্তু এ নিয়ে ওদের কোনো অভিযোগ ছিল না। পরিবারকেই আমার এ অবস্থানে আসার ক্রেডিট দিতে চাই।

আপনার মেয়ে আমেরিকা থাকেন, আপনি দেশে পড়ে রইলেন কেন?

ভাগ্য ওদের টেনে নিয়ে গেছে। আমি কখনো চাইনি ওরা দূরে থাক, ওরাও চায়নি। ওরা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল আমাকে রাখার জন্য, কিন্তু শিকড়ের টানে আবার চলে এসেছি।