এক অনন্য চলচ্চিত্র নির্মাতা বেলা তার। হাঙ্গেরির মানুষ হলেও তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে উঠেছেন ‘স্লো সিনেমা’র প্রতীক হিসেবে। কিন্তু নীরবতা ও স্থিরতার দার্শনিক নির্মাতা হয়ে ওঠার বহু আগেই বেলা তার ছিলেন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রকার। রুক্ষ, অস্থির, ক্ষুব্ধ ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন। তার প্রাথমিক পর্যায়ের চলচ্চিত্রগুলো সমাজতান্ত্রিক হাঙ্গেরিতে বসবাসকারী মানুষের জীবনের এক তীব্র ও স্পর্শকাতর প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছিল। সেখানে কোনো মিথ, প্রতীক কিংবা অধিবিদ্যার আশ্রয় নেই, বরং রয়েছে দারিদ্র্যের প্রতিদিনের নিঃশব্দ সহিংসতা, তীব্র বাসস্থান সংকটের চাপ, দাম্পত্য সম্পর্কের ক্রমাগত ভাঙন এবং মানসিক স্থবিরতার ধীরে ধীরে ঘটে যাওয়া কিন্তু নির্মম ক্ষয়। প্রায়ই উপেক্ষিত এ সিনেমাগুলো বেলা তার এর এমন এক মুখ উন্মোচন করে, যা তার পরবর্তী ধীর ও আত্মমগ্ন চলচ্চিত্রভাষা থেকে বিস্ময়করভাবে আলাদা।

15

ফ্যামিলি নেস্ট (১৯৭৯)

বেলা তারের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ফ্যামিলি নেস্ট’ কর্মজীবী শ্রেণীর সংগ্রামের এক চমকপ্রদ প্রতিচ্ছবি। মাত্র ২৩ বছর বয়সে নির্মিত চলচ্চিত্রটি তৈরি করা হয়েছিল ‘সিনেমা ভেরিটে’ ভঙ্গিতে। সেখানে প্রায় অপেশাদার অভিনেতারা অভিনয় করেছেন। এটি সম্পূর্ণভাবে গঠিত চিত্রনাট্য ছিল না। সিনেমার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এক দম্পতি। তারা হাঙ্গেরির তীব্র বাসস্থান সংকটের কারণে আত্মীয়দের সঙ্গে ক্ষুদ্র কক্ষ ভাগ করে নিতে বাধ্য হয়েছিল। সংকীর্ণ অ্যাপার্টমেন্টের দেয়াল ও করিডরের মধ্যে বেলা তার ক্যামেরা বসিয়ে সিনেমা শুট করেছিলেন। কোনো নান্দনিক সৌন্দর্য ধরার জন্য নয়, বরং নিরপেক্ষ সামাজিক পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তিনি। ঝগড়া, হতাশা, অপমান সবই বাস্তব সময়ের মধ্যে ফুটে উঠেছে, কোনো রূপক বা সুনির্দিষ্ট গল্পের কাঠামোয় নয়, বরং ক্রমাগত হতাশার মাধ্যমে তা এসেছে।

16

দি আউটসাইডার (১৯৮১)

‘দি আউটসাইডার’ সিনেমায় বেলা তার পারিবারিক বলয় থেকে বেরিয়ে এসে সমাজতান্ত্রিক সমাজের বৃহৎ জটিলতায় প্রবেশ করেন। সিনেমাটি এক তরুণের জীবনকে অনুসরণ করে নির্মিত হয়েছে। সে নিজেকে কোনো কিছুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না—না কর্মের সঙ্গে, না সম্পর্কের, না দায়িত্বের। এ সিনেমায় একটি বিশেষ অনুভূতি বিরাজ করে। গতি আছে, কিন্তু কোনো গন্তব্য নেই। পরবর্তী সময়ে এ সিনেমার অনুপ্রেরণাই বেলা তারের ধীর, রূপকভিত্তিক চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্যে পরিণত হয়, কিন্তু এ সিনেমায় এটি সম্পূর্ণভাবে সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেই নিহিত।

দ্য প্রিফ্যাব পিপল (১৯৮২)

‘দ্য প্রিফ্যাব পিপল’ বেলা তার এর প্রাথমিক সামাজিক বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্রের ধারাকে আরো গভীরভাবে তুলে ধরেছে। সিনেমাটি একটি আধুনিক হাঙ্গেরিয়ান অ্যাপার্টমেন্টে এক মধ্যবিত্ত দাম্পত্য জীবনের ক্লান্তিকর, সংকীর্ণ পরিবেশের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভাঙন দেখায়। সিনেমাটির কেন্দ্রে রয়েছে এক দম্পতির জীবন, যাদের সম্পর্ক কোনো নাটকীয় বা আকর্ষণীয় ঘটনার মাধ্যমে নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনের একই রূপ, একঘেয়ে পুনরাবৃত্তি এবং ছোট ছোট সংঘাতের মধ্য দিয়ে ক্রমে ভেঙে যায়। এ চলচ্চিত্রে তারের প্রাথমিক বাস্তবধর্মী শৈলী স্পষ্ট, যেমন হ্যান্ডহেল্ড শট, সংলাপের স্বাভাবিকতা এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রতি সতর্ক পর্যবেক্ষণ। এ সিনেমায় তার দেখান কীভাবে মানুষ শারীরিকভাবে স্বাধীন থাকলেও সামাজিক কাঠামো, জীবনধারার একঘেয়েমি ও আবদ্ধতা তাদের মানসিকভাবে বন্দি করে রাখতে পারে। এ সিনেমা একটি উদাহরণ, যেখানে তার সিনেমার সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত অন্তর্দৃষ্টি একত্রিত হয় এবং দর্শককে নীরব, তবে তীব্রভাবে মানবিক সংকট অনুভব করতে বাধ্য করে।

17

যদিও বেলা তারের পরবর্তী সিনেমাগুলোয় চিত্রভাষা, দীর্ঘ শট ও সংলাপের ন্যূনতম ব্যবহার তার শিল্পজীবনের পরিচয়কে সংজ্ঞায়িত করেছে, কিন্তু এ তিনটি চলচ্চিত্রে তিনি প্রথমবার তার ক্যামেরা ঘুরিয়েছেন মানুষের জীবনকে গড়ে তোলার সামাজিক কাঠামোর দিকে, বাসস্থান সংকট, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, দাম্পত্য চাপ ও প্রজন্মান্তরের দ্বন্দ্ব। পর্যায়টি তার কাজের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তার শিল্পীজনিত সংবেদনশীলতার বিকাশের পথচিহ্ন তুলে ধরে, সামাজিক বাস্তবতার জরুরি পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে দার্শনিক ও অস্তিত্ববাদী প্রতিফলনে পৌঁছনোর যাত্রা দেখায়। এ প্রাথমিক চলচ্চিত্রগুলোই দেখায়, কীভাবে বেলা তার সামাজিক বাস্তবতা থেকে ধীরে ধীরে সময়, পুনরাবৃত্তি ও মানব অস্তিত্বের গভীর প্রশ্নের দিকে অগ্রসর হয়েছেন।