ডমিনিক ব্লেকের কাজ আর দশটা মানুষের মতো নয়। কারো কারো কাছে রীতিমতো কেলেঙ্কারি! ৪০ বছর বয়সী ব্লেক চিত্রশিল্পীদের ছবি আঁকার মডেল। যে সে মডেল নয়, তিনি ন্যুড মডেল। আমাদের ভাবনা মতো এ কাজের শুরুটা ব্লেকের জন্য সহজ ছিল না। প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা তো রীতিমতো ভয়ানক, ‘আমি তখনো গায়ে গাউন চড়িয়ে রেখেছি, বুঝতে পারছি আমার মুখমণ্ডল বেয়ে ঘাম নামছে। অন্তত ৪০ জন মানুষের ৮০ জোড়া চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি দরজা, জানালার দিকে তাকাচ্ছিলাম কীভাবে পালানো যায়, সে পথ খুঁজতে।’
ন্যুড মডেল হিসেবে ব্লেকের কাজ তার জীবন বদলে দিয়েছিল। শারীরিক গঠন সুন্দর ও বীরপুরুষোচিত না হওয়ায় সচেতন হওয়ার পর থেকেই হীনম্মন্যতায় ভুগতেন ব্লেক। ন্যুড মডেল হওয়ার জন্য পুরাণের গ্রিক বীরদের মতো নিখুঁত পেশিবহুল শরীর থাকতে হবে, এমন কথা নেই। ‘সে সময় নিজের শরীর নিয়ে আমার খুবই নেতিবাচক মনোভাব ছিল। এ মনোভাব আমাকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছিল। বড় হওয়ার সময় আমার অভিজ্ঞতা অন্যদের মতো ছিল না। পঁচিশের আগে আমার কোনো গার্লফ্রেন্ড ছিল না।’ কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় ব্লেক ন্যুড মডেল হিসেবে কাজ শুরুর পর থেকে। ব্লেককে দেখে দেখে শিল্পীরা তাদের তুলির আঁচড় দিচ্ছিলেন। ব্লেক খেয়াল করলেন শিল্পীরা তাকে অন্যদের চেয়ে ভিন্নভাবে বিবেচনা করছেন না। ‘তারপর আমি তাদের আঁকা আমার ছবিগুলো দেখলাম। এটা ছিল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। বুঝতে পারলাম আমরা সবাই দুনিয়াতে একসঙ্গে ভ্রমণ করছি।’ প্রথমবারের মতো ব্লেক টের পেলেন তার দৃষ্টিতে নিজের অসুন্দর শরীর সুন্দর শিল্পকর্মে রূপ নিয়েছে, তিনি নিজে এক সৃষ্টিশীল কর্মের অংশ হয়ে উঠেছেন।
সুযন লাগার্দে ২৫ বছর বয়সী চিত্রশিল্পী। তিনি জন্মেছিলেন অ্যামনিয়োটিক ব্যান্ড সিনড্রোম নিয়ে। তার হাত ও পায়ের আঙুলগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হয়নি এবং সব আঙুলও ছিল না। নিজে ছবি আঁকলেও ন্যুড মডেলিং নিয়ে তার অস্বস্তি ছিল, বিশেষত তার শারীরিক গঠনের খামতি নিয়ে। ব্লেকই তাকে ন্যুড মডেল হতে রাজি করান। লন্ডনে লাগার্দের নিজের স্টুডিও আছে। ‘আমি অপেক্ষা করছিলাম এমন একটা দিনের জন্য, যখন কেউ আমাকে বলবে তোমার আঙুল নেই, তাই বরং তোমার মডেল হওয়া উচিত।’ লাগার্দে একই সঙ্গে শিল্পী ও মডেল হওয়ায় তার অভিজ্ঞতা অন্যদের তুলনায় সমৃদ্ধ। তার মতে, সবাই মনে করেন কেবল ন্যুড মডেলই শিল্পীদের চোখের সামনে অস্বস্তিতে থাকেন, কিন্তু ব্যাপারটা এমন নয়, শিল্পী নিজেও আঁকতে গিয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েন, কারণ শিল্পীকে নিজের কাজকে বারবার প্রশ্ন করতে হয়, নিজেকে বিচার করতে হয়।
ন্যুড মডেলরা প্রমাণ আকার বা লাইফ মডেল। বিতর্ক আছে এ লাইফ মডেলরা শুধুই মডেল নাকি তারা নিজেরাও শিল্পী। ব্লেক এ বিষয়ে আর্ট গ্যালারিগুলোয় কয়েকটি বক্তৃতা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ব্লেক মনে করেন, তারা নিছক শিল্পীদের ছবির মডেলের চেয়ে বেশি কিছু, তারা পুরো সৃষ্টিকর্মের অংশীদার। তারা পুরো পরিবেশকে তাদের দেহের ভঙ্গি দিয়ে ‘আঁকেন’। তাদের ভঙ্গিতে থাকে নাচ কিংবা পারফরম্যান্স আর্টের সৌন্দর্য। লাইফ মডেলদের নিছক মডেল হিসেবে বিবেচনা করা নিয়ে ব্লেকের ক্ষোভ আছে, ‘লাইফ মডেলদের দীর্ঘদিন ধরেই দাস-চাকরের মতো বিবেচনা করা হয়। এখানে একটা আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর মতো ব্যাপার আছে। শিল্পী হচ্ছেন এ কাঠামোর শীর্ষ ব্যক্তি আর মডেলরা থাকেন নিচের তলায়।’
ব্লেক বহুবার শুনেছেন তিনি শিল্পী কিনা, মানে তিনি কি আঁকেন, ভাস্কর্য তৈরি করেন, ছবি তোলেন? যেহেতু তিনি এগুলো করেন না, তাই তিনি শিল্পী নন।
লাইফ মডেলরা যে শিল্পী, সে বিষয়ে শক্ত যুক্তি আছে। লাইফ মডেল তার সামনে থাকা শিল্পীদের নির্দেশনা দেন, তার ভঙ্গিকেই শিল্পীরা অনুসরণ করেন। আর নির্দেশনা যিনি দেন, তিনি নিশ্চয়ই শিল্পী। মডেলরা সাধারণত তাদের পোজ নিজেরাই ঠিক করেন, এক্ষেত্রে শিল্পীদের খবরদারি করার সুযোগ থাকে না।
ব্লেক মনে করেন লাইফ মডেল হওয়াটা কঠিন কাজ। এটা খুবই ক্লান্তিকর, একঘেয়ে কাজ হয়ে উঠতে পারে। ‘আপনি আপনার নির্দিষ্ট পোজ ভাঙতে চাইবেন না, এমনকি আপনার হাতটা অবশ হয়ে যেতে পারে, পাটা ব্যাথায় নীল হয়ে যেতে পারে। এ ভাঙতে না চাওয়াটা লাইফ মডেলের গৌরব। ব্লেক দিনে প্রায় ১৮ ঘণ্টা কাজ করেন এবং সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিন। অনেক সময় টানা ছয় ঘণ্টাও একই ভঙ্গিতে পোজ দিয়েছেন ব্লেক। ‘পোজ দিয়ে থাকা অবস্থায় একটা মিনিটও ঘণ্টার মতো মনে হতে পারে, রাতে দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন। কিন্তু এসবের বিনিময়ে আপনি শিখতে পারবেন আপনার শরীরের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করতে হয়। আপনি এমনভাবে নড়বেন যে সেটা কারো চোখে পড়বে না।’
মডেলিংয়ের সময় নিজের অনেক মজার অভিজ্ঞতার কথায় শুনিয়েছেন ব্লেক। একবার গরমে তার পাশে থাকা এক মডেল অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। আরেকবার এক মডেলের কাছে তার পোজ পছন্দ হয়নি বলে নিজেই ভঙ্গি পরিবর্তন করে ফেলেন। নারী মডেলরা অনেক সময় মৌখিক হেনস্থার শিকার হন। যদিও সমস্যাটি এখনো প্রকট আকারে দেখা দেয়নি।
ব্লেকের মতে, লাইফ মডেলকে শিল্পী হিসেবে দেখা না- দেখার সঙ্গে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির যোগ আছে। যদি মডেলরা একট পণ্য বা কাজের অংশ হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের মজুরি বাড়াতে হবে। কিন্তু কাজের স্বীকৃতি না থাকায় ব্লেকই অনেক স্টুডিওতে ক্লিনারের চেয়ে কম পারিশ্রমিক পান। ব্লেক জানান, তিনি মডেল হয়েছেন এমন চিত্রকর্ম যদি ৪০ হাজার পাউন্ডে বিক্রি হয় আর তিনি পারিশ্রমিক পান ২০০ পাউন্ড, তাহলে সেটা অবশ্যই বৈষম্য। তবে মজুরি বৈষম্য থাকলেও সাধারণত যারা ন্যুড মডেল হিসেবে কাজ করেন, তারা সবাই টাকার জন্য তা করেন না। অনেকের কাছেই কাজটি শারীরিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান










