একাডেমি অব মোশন পিকচার অ্যান্ড সায়েন্সেস সিনেমা নিয়ে নানা ধরনের কাজ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়টি হলো অস্কার দেয়া। তবে এর বাইরেও একাডেমির অনেক কাজ আছে। এর মধ্যে একটি হলো বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধরনের সিনেমা সংরক্ষণ ও প্রদর্শন। সে ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠানটি এবার মিউজিয়ামে আনছে ১২টি ভারতীয় চলচ্চিত্র। ৭ মার্চ থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত প্রদর্শিত হবে সিনেমাগুলো। এ তালিকায় আছে ‘মাদার ইন্ডিয়া’, ‘মন্থন’, ‘অমর আকবর অ্যান্থনি’, ‘ইশানোউ’, ‘কুমাট্টি’, ‘মির্চ মাসালা’, ‘দেবদাস’, ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’, ‘যোধা আকবর’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘মায়া দর্পন’ ও ‘ইরুভার’।

এ আয়োজন মূলত ভারতীয় সিনেমার রঙিন দুনিয়া বা ইন্ডাস্ট্রিকে বিশ্বের দর্শক সমালোচকদের সামনে তুলে ধরার জন্য। কেবল সিনেমা নয়, একটা দেশের সিনেমার গল্প বলা, সিনেমাটোগ্র্যাফি, সংগীত, সিনেমা ভাবনা বোঝার জন্য এমন আয়োজন ভূমিকা রাখে। তাদের সিনেমা কেমন করে এগিয়েছে, তাও বোঝা যায়। তালিকার দিকে নজর দিলেই লক্ষ্য করা যাবে, ভারতের বিভিন্ন ভাষা ও বিভিন্ন সময়ের সিনেমা রাখা হয়েছে। এর কারণ ভারতীয় সিনেমার যাত্রা, গতিপথ বোঝার চেষ্টা। কোনো সিনেমায় হয়তো সময়ের কথা আছে, কোনোটিতে একটা অঞ্চল। একাডেমি দেখতে চায় ভারতীয় সিনেমা কেমন করে ইতিহাস উপস্থাপন করে। কেমন করে তার মানুষকে উপস্থাপন করে। নারীর কণ্ঠস্বর তাদের সিনেমায় আছে কিনা তাও গুরুত্বপূর্ণ। ১২টি সিনেমা নিয়ে এ আয়োজনের নাম দেয়া হয়েছে ‘ইমোশন ইন কালার: আ ক্যালাইডোস্কোপ অব ইন্ডিয়ান সিনেমা’।

21

আয়োজনটি নিয়ে ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুর বলেন, ‘আমাদের সংস্কৃতি যদি একটা কাপড় হয়, সেটা আসলে নানা রঙে চোবানো। আমাদের সিনেমায়ও আমাদের সংস্কৃতির কথা আছে। আমাকে ডেকে যখন একাডেমি এ দায়িত্ব দিল, তখন দেখলাম বিষয়টা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কোন সিনেমা ছেড়ে কোনটা রাখব বুঝতে পারছিলাম না। আসলে ভারতীয় সিনেমার এত রঙ যে সেখান থেকে অল্প কিছু বাছাই করা কঠিন।’

ভারতের সিনেমা বা ইন্ডাস্ট্রি বলতে এখনো অনেকে কেবল বলিউড ও হিন্দি সিনেমাকে মনে করে। কিন্তু বাস্তবিক ভারতের সিনেমার পরিসর আরো বড়। শিবেন্দ্র বলেন, ‘হিন্দি সিনেমা ছাড়াও ভারতে আরো পাঁচটি প্রধান ভাষাভিত্তিক ইন্ডাস্ট্রি আছে—তামিল, তেলেগু, কন্নড়, মালয়ালম ও বাংলা। এরা সব মিলে প্রতি বছর প্রায় দুই হাজার সিনেমা নির্মাণ করে। এছাড়া দেশের অন্যান্য প্রান্তে প্রতি বছর আরো সিনেমা তৈরি হয়। সেখান থেকে মাত্র ১২টি সিনেমা বাছাই করেছি। এ সিনেমাগুলো আসলে শিল্পগুণ ও ভারতের সিনেমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য অনন্য। ভারতের সিনেমার একটা মোজাইক দেখানোর মতো হবে ব্যাপারটা।’

22

তালিকায় থাকা সিনেমাগুলো আসলেই ভারতের সিনেমার জন্য বিশেষ। ১৯৫৭ সালে মেহবুব খানের পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘মাদার ইন্ডিয়া’। সিনেমাটি সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত ভারতের সিনেমায় কাল্ট ক্ল্যাসিক হিসেবে পরিচিত। এতে অভিনয় করেছিলেন নার্গিস ও সুনীল দত্ত।

শ্যাম বেনেগালের সিনেমা ‘মন্থন’ মুক্তি পায় ১৯৭৬ সালে। এতে ভারতের গ্রাম, সমবায়, নারীর অবস্থান ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে।

তবে ‘অমর আকবর অ্যান্থনি’ ভিন্ন ধারার। সিনেমাটি বাণিজ্যিক ধারার এবং দর্শক আনন্দ নিয়ে দেখে এখনো। সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৭ সালে। পরিচালক মনমোহন দেশাই। অভিনয়ে অমিতাভ বচ্চন, বিনোদ খান্না, ঋষি কাপুর, পারভীর বাবি, নীতু কাপুর ও শাবানা আজমী।

‘ইশানোউ’ ১৯৯০ সালের সিনেমা। মণিপুরী নির্মাতা আরিবাম শ্যাম শর্মা নির্মাণ করেন সিনেমাটি। মণিপুরী সংস্কৃতির কথা বলে এটি। ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন সিনেমাটি পুনরুদ্ধার করেছে।

মালয়ালম নির্মাতা গোবিন্দন অরবিন্দনের সিনেমা ‘কুমাট্টি’। একটা গ্রাম, তার মানুষ, পরিবেশ ও প্রতিবেশের কথা বলে ১৯৭৯ সালে নির্মিত সিনেমাটি। এদিকে ১৯৮৭ সালে কেতন মেহতার পরিচালনায় নির্মিত সিনেমা মির্চ মাসালা অন্য ঘরানার।

এ শতাব্দীর তিনটি সিনেমা তালিকায় আছে। দুটোই শাহরুখ খান অভিনীত। দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে তালিকায় রাখা হয়েছে। ভারতীয় রোমান্টিক সিনেমা ইতিহাসে এর অবস্থান আলাদা। এছাড়া আছে সঞ্জয় লীলা বানসালি পরিচালিত ‘দেবদাস’। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এ উপন্যাস থেকে সিনেমা নির্মিত হয়েছে বহুবার। বানসালির সিনেমাটি শৈল্পিক দিক থেকে অনেক এগিয়ে বলে মনে করেন সমালোচকরা। এছাড়া আছে আশুতোষ গোয়ারিকর পরিচালিত যোধা আকবর।

মণি রত্মমের ‘ইরুভার’ মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন মোহনলাল, ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, টাবু, প্রকাশ রাজ প্রমুখ। তামিল অভিনেতা এমজি রামচন্দ্রর জীবন অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি তামিল সিনেমার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭২ সালে মুক্তি পাওয়া কুমার সাহনির ‘মায়া দর্পণ’ হিন্দি সিনেমার ক্ষেত্রে আলাদা মনোযোগ দাবি করে। সমালোচকরা সিনেমাটিকে এগিয়ে রাখেন। এছাড়া সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ থাকছে এ তালিকায়। সত্যজিতের অন্য অনেক সিনেমার তুলনায় কাঞ্চনজঙ্ঘার গল্প ও চরিত্রগুলোর মানসিক দ্বন্দ্ব বিস্তৃত আলোচনার দাবি রাখে বলে সমালোচকরা মনে করেন।