স্যার ডেভিড অ্যাটেনবোরো একটি নতুন কাজ করছেন। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি পরিবেশ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করে গেছেন। সেগুলো কখনো ছিল তথ্যচিত্র, কখনো পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা। এবার ৯৯ বছর বয়সে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় প্রজেক্ট নিয়ে এসেছেন। তিনি জানান, এটি তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। পূর্ণদৈর্ঘ্যের এ চলচ্চিত্রের নাম ‘ওশান’ এবং এটি জীববৈচিত্র্য ও উদ্ভিদ রক্ষায় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি। নিজের ১০০ বছর বয়সে পা রাখার মুহূর্তে কাজটি করতে চেয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে বলেন, ‘আমি এখন বুঝতে পারছি পৃথিবীতে স্থল নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সমুদ্র।’

সিনেমাটি বলতে চায়, সমুদ্র মূলত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাপোর্ট সিস্টেম এবং সমুদ্রই জলবায়ু সমস্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ থেকে এ গ্রহকে বাঁচিয়ে রাখে। স্যার অ্যাটনবোরোর জন্মদিনে বিশেষ আয়োজন হয়েছিল আর সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং রাজা চার্লস। চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার হওয়ার আগে তারা একসঙ্গে ছবি তোলেন। ওশানের প্রিমিয়ারের আগে প্রিন্স চার্লস একটি ব্যক্তিগত আয়োজনে সারা দেশ থেকে আসা শতাধিক স্কুলছাত্রের সঙ্গে সিনেমাটি দেখেছেন।

7

ওশানের প্রযোজক টোবি নোলান জানান, এটি অ্যাটেনবোরোর অন্য সিনেমাগুলোর মতো নয়। তিনি বলেন, ‘এটা প্রকৃতির ইতিহাসকে নতুন করে দেখার মতো কোনো বিষয় নয়। আসলে এটা একটা মহৎ বার্তা দেয়ার মতো বিষয়, যা আগে কেউ কখনো করেনি।’

এ চলচ্চিত্রে পৃথিবীর সমুদ্রগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং সমুদ্রগুলো কীভাবে কাজ করে তার একটা চিত্র তুলে ধরা হবে। স্যার অ্যাটেনবোরো জীবনভর এ জিনিসগুলো দেখেছেন। সেখান থেকেই চলচ্চিত্রটি তৈরি করার চিন্তা করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি হয়েছে।

ওশান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্যার অ্যাটেনবোরো তার প্রথম স্কুবা ডাউভিংয়ের স্মৃতিচারণ করেছেন। ১৯৫৭ সালে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে প্রথম তিনি স্কুবা ডাউভিং করেন। তিনি সে স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমার এমন অবস্থা হয়েছিল যে শ্বাস নিতেও ভুলে গিয়েছিলাম।’ দীর্ঘ সময় সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে স্যার অ্যাটেনবোরো জানেন, এ সময় সমুদ্রের নানা পরিবর্তন এসেছে। সমুদ্র বদলে গেছে। তার সক্ষমতাও কমেছে। তিনি মনে করেন সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।

তাহলে চলচ্চিত্রে স্যার অ্যাটেনবোরো কী আনছেন? ওশান নামের এ চলচ্চিত্রে বেশকিছু গ্র্যাফিকস ফুটেজ আছে। এতে পৃথিবীর সনাতন ধারার মাছ ধরার বেশকিছু দৃশ্য আছে। এর মাধ্যমে দেখানো হয়েছে বাণিজ্যিকভাবে মাছ ধরা কেমন করে সমুদ্রের ওপর প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, ‘যেভাবে মাছ ধরা হয়, তাতে মাছের পাশাপাশি সমুদ্রের ক্ষতি হয়। এটা মাছ ধরার কোনো সুস্থ পন্থা নয়।’ সেই সঙ্গে মানুষ যেভাবে সমুদ্রকে নিজের কাজে ব্যবহার করছে, তাতে সমুদ্রের তলদেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি গভীর সমুদ্রের প্রাণীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া এর মধ্য দিয়ে প্রচুর কার্বন-ডাইঅক্সাইডও নিঃসরণ হয়। অথচ এ ব্যবস্থাই সমর্থন করে আসছে পৃথিবীর বেশির ভাগ সরকার।

তিমিদের কথাও বলেছেন স্যার অ্যাটেনবোরো। কেননা তিমিদের কাছ থেকে একটা সময় ইতিবাচক মনোভাব পেয়েছেন তিনি। স্যার অ্যাটেনবোরো জানান, একটা হিসাব থেকে দেখা গেছে, বিশ শতকে ২৯ লাখের বেশি তিমি মারা গেছে শিকারিদের হাতে। এমন আরো চললে প্রাণীটি হারিয়ে যেতে বেশি সময় লাগবে না। মাত্র ১ শতাংশ নীল তিমিই বেঁচে ছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার মনে আছে, তখন ভাবছিলাম যে এর মধ্য দিয়েই সব শেষ। এখান থেকে ফেরার কোনো পথ নেই।’

৯৯ বছরেও দারুণ সক্ষম স্যার অ্যাটেনবোরো। তার মনে হয়েছে, এ সময়ে এসে কাজটা না করলে আর করা হতো না। তিনি জানেন, বেশকিছু দেশই সমুদ্র রক্ষার প্রতিজ্ঞা করেছে। ডেভিড অ্যাটেনবোরো মনে করেন, তার সিনেমার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারকে পুনরায় বিষয়টি মনে করিয়ে দেবেন। তিনি বলেন, ‘সমুদ্রকে আবারো আগের অবস্থায় ফেরানো সম্ভব। যদি সমুদ্রকে নিজের মতো থাকতে দেয়া হয়, তাহলে নিজে থেকেই এক-তৃতীয়াংশ ঠিক হয়ে যাবে।’

ডেভিড অ্যাটেনবোরো যে বার্তা দিতে চান, তা হলো সামনে এখনো আমাদের জলবায়ু, খাদ্য ও বাসস্থান রক্ষার সুযোগ আছে।

বিবিসিতে প্রকাশিত জাস্টিন রাওলাটের নিবন্ধ অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান