অমিতাভ বচ্চন অভিনীত সিনেমা ‘ডন’। এটি তার তারকাখ্যাতিকে আরো সুদৃঢ় করে তোলে। ‘জঞ্জির’, ‘দিওয়ার’ ও ‘শোলে’র সাফল্যের পর সিনেমাটি অমিতাভকে এগিয়ে নেয়। কিন্তু মুক্তির আগেই সিনেমার প্রযোজক নরিমান ইরানি আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। সিনেমা মুক্তির আগেই তিনি দেউলিয়া হন, এমনকি মারাও যান। তিনি ডনের সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। সিনেমার লভ্যাংশ দিয়ে ইরানির ঋণ শোধ করা হয়েছিল।
সিনেমার পরিচালক চন্দ্র বারোট মারা গেলেন কিছুদিন আগে। তিনি জানিয়েছেন, এ সিনেমায় একটি নতুন গান যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন মনোজ কুমার। এক সাক্ষাৎকারে গীতিকার সমীর আনজানও বলেছিলেন, জাভেদ আখতার জোর দিয়েছিলেন একটি নতুন গান যুক্ত করার জন্য। কিন্তু তখন অর্থসংকট চরমে। কিন্তু শেষে গান যুক্ত করা হয় এবং গানটি ছিল ‘খাইকে পান বনারসওয়ালা’।
সিনেমা নির্মাণের শুরুর পরিকল্পনা অনুসারে, এ গান সিনেমায় থাকার কথাই ছিল না। জাভেদ আখতারও চেয়েছিলেন, সিনেমার দ্বিতীয়ার্ধে গান থাকুক। এ নিয়ে গীতিকার সমীর বলেন, ‘সিনেমা দেখার পর জাভেদ আখতারের মনে হয়েছিল দ্বিতীয়ার্ধ একটু বেশিই অ্যাকশন-নির্ভর হয়ে গেছে। কিছুটা ভারসাম্য আনার জন্য একটি গান দরকার। তিনি একরকম জেদ ধরেন, ‘‘একটা গান চাই-ই চাই’’। কিন্তু তখন সিনেমার কাজ শেষ, মুক্তির দিনও চূড়ান্ত। তখন আমার বাবাকে ডাকা হয়। ছবির প্রযোজক নরিমান ইরানির তখন খাবার কেনার টাকাও ছিল না।’
সমীরের কথায়, ইরানি তখন জাভেদকে বলেন যে নতুন করে গান শুট করা একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু জাভেদ আখতার কোনোভাবেই না শুনে বলেন, ‘এ গান চাই।’ গানটি তৈরি করা হয়। কিন্তু এরপর দেখা দেয় আরো একটি সমস্যা। অমিতাভ বচ্চন বিদেশ যাচ্ছিলেন এবং এক মাসের জন্য অনুপস্থিত থাকবেন। গান শুট করার জন্য মাত্র একদিন সময় ছিল এবং কোনো সেটও ছিল না। তখন পরিকল্পনা হয় গোরেগাঁওয়ের একটি তাবেলায় (গরু রাখার জায়গা) গানটি শুট করার।

সমীর বলেন, ‘আপনি বিশ্বাস করবেন না, তারা আসলে একটি তাবেলায় গিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গানটি শুট করেন এবং বাকিটা ইতিহাস।’
এদিকে নরিমান ইরানির কাহিনী ছিল অত্যন্ত করুণ। সিনেমা মুক্তির কয়েক সপ্তাহ আগে, একটি মঞ্চে হঠাৎ বৃষ্টির কারণে একটি দেয়াল ভেঙে পড়ে তার মৃত্যু হয়। তখন তিনি মনোজ কুমারের একটি ছবির সেটে ছিলেন।
২০০৬ সালে রেডিফকে দেয়া সাক্ষাৎকারে পরিচালক চন্দ্র বারোট বলেন, ‘ডন বানানোর পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল নরিমান ইরানিকে সাহায্য করা। তার প্রথম সিনেমা ‘জিন্দেগি জিন্দেগি’। সুনীল দত্ত অভিনয় করেছিলেন সিনেমায়। কিন্তু সেটি খুব বাজেভাবে ফ্লপ করেছিল। তখন তিনি চরম ঋণে ডুবে যান। আমরা তার বন্ধু হিসেবে তাকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিই। অমিতাভ বচ্চন, প্রাণ, সেলিম-জাভেদ ও জিনাত আমান এ সিনেমায় কাজ করতে এগিয়ে আসেন। সিনেমাটি বানাতে লেগেছিল তিন বছর ছয় মাস। প্রচণ্ড বাজেট সংকট ছিল, কিন্তু আমরা জানতাম ভালো কিছু বানাতেই হবে।’
চন্দ্র বারোট আরো বলেন, ‘ডন সিনেমার বাজেট ছিল প্রায় ২৫ লাখ রুপি। নরিমান ইরানির মৃত্যুর পর আমরা কোনো প্রচারণা ছাড়াই সিনেমার কাজ শেষ করি। যখন ডন ব্লকবাস্টার হিট হয়, আমরা প্রযোজকের বিধবা স্ত্রী সালমা ইরানিকে সে টাকা দিই, যেন তিনি স্বামীর ঋণ শোধ করতে পারেন।’
রেডিফের সঙ্গে আরেক সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী জিনাত আমান বলেন, ‘নরিমান ইরানি একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন। আমি তখনই তার সঙ্গে কাজ করেছিলাম “রোটি কপড়া অউর মকান” সিনেমায়। চন্দ্র বারোট তখন মনোজ কুমারের সহকারী ছিলেন। আমরা সবাই সে ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেছিলাম। ডনের কাজটাও ছিল একেবারে পারিবারিক পরিবেশে। এমনকি যখন তিনি মারা যান, আমি আমার পারিশ্রমিক নিইনি।’
দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান










