পরিবার ছাড়া দেখা নিষেধ—এ কথার ওপর জোর দিয়ে প্রচারণা চালানো হয়েছিল উৎসব সিনেমার। এখনকার অনেক পরিচালকই পারিবারিক সিনেমাকে টিভি সিরিয়ালের কাতারে ফেলে বাতিল করে দিতে চান। থ্রিলার-অ্যাকশন সিনেমার রক্তারক্তি-হিংস্রতা, সমকালীন তপ্ততাকে পেরিয়ে একটা তুমুল পারিবারিক ছবি বানানো ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ।

রাজার মাথার ওপর সবসময় ঝুলতে থাকা তলোয়ারের মতো প্রশ্ন থাকে—অফবিট পারিবারিক সিনেমা দর্শক টানতে আদৌ সক্ষম হবে? অথচ দিনের পর দিন হাউজফুল থেকে প্রেক্ষাগৃহের আমেজটাই বদলে দিল উৎসব। পাওয়া না-পাওয়ার এক চিরপরিচিত আক্ষেপকে আঁকড়ে ধরে উৎসব আসলে ‘সেলিব্রেশন অব লাইফ’। চার্লস ডিকেন্সের ‘আ ক্রিসমাস ক্যারোল’-কে একদম দেশী ঢঙে, মফস্বলের ঘ্রাণ মাখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে নব্বইয়ের জাদুকরী দিনগুলোয়। ভাইবোনদের খুনসুটি, প্রতিবেশীদের সঙ্গে হুল্লোড়, চাঁদরাত, সন্ধ্যায় হারিয়ে যাওয়া ট্রেনের সঙ্গে জীবনের বাঁকবদল—সব মিলিয়ে উৎসব এক বিস্মৃত সময়ের গল্প।

গল্প শুরু হয় ঢাকার মোহাম্মদপুরের শান্তি নীড়ে চাঁদরাতের আয়োজন দিয়ে। চাঁদরাত মানেই শান্তি নীড়ের ছাদে পাড়া-প্রতিবেশীদের নিয়ে তুমুল আয়োজন। বাড়িওয়ালা মোবারক সাহেবের হারমোনিয়াম নিয়ে গান ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। তবে গান শেষ করার আগেই অকস্মাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন মোবারক। ক্লোজশটে দেখা গেল জাহাঙ্গীরের মুখ। ভাইয়ের এ শোকাবহ মৃত্যুর পর হাড়কিপ্টে জাহাঙ্গীর উত্তরাধিকারসূত্রে উৎসব কমিউনিটি সেন্টার চালানো শুরু করলেন। কর্মীদের ঠিকঠাক বোনাস আর ছুটি দিতেও তার কিপ্টেমির তল নেই। এলাকায় বাচ্চাদের ব্যান্ড গানের নামে ‘চিৎকার’ সহ্য হয় না একটুও। তার উৎপাতে এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলে। এমন লোককে সবাই ‘খাইস্টা জাহাঙ্গীর’ বলবে তাতে আশ্চর্যের কী আছে!

এক তুমুল ঝড়ের রাতে এ জাহাঙ্গীরের জীবনই আদ্যোপান্ত বদলে যায়। তার ভাই মোবারকের ভূত নেমে আসে গভীর রাতে আঁধারের ফাঁক গলে। চঞ্চল চৌধুরী, জয়া আহসান আর অপি করিমের বেশ ধরে তারা দর্শককেও দেখাতে শুরু করে বর্তমান-অতীত-ভবিষ্যতে জাহাঙ্গীরের জীবনের সফরনামা। আফসোস-আক্ষেপ-প্রায়শ্চিত্তের এক ভীষণ আদুরে গল্পে কান্না আর হাসির মুহূর্তরা মিলেমিশে একাকার। এত সূক্ষ্মভাবে অপরাধবোধে ভোগা হীনম্মন্য একজন মানুষের জীবনকে পরতে পরতে খুলে দেখানো হয়েছে যে তাকে দূরের কেউ মনে হয় না।

ট্র্যাজিক-কমেডি ঘরানার গল্পের শরীরকে হাড়-রক্তমাংস দিয়েছেন আয়মান আসিব স্বাধীন। সাধারণত এ ধরনের সিনেমায় অনেক ক্ষেত্রেই চড়া মেজাজের হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। জোর করে না হাসিয়ে বরং তীক্ষ্ণ পরিমিতিবোধ দিয়ে দুদিকের ভারসাম্য রক্ষা করেছে লেখক স্বাধীনের সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ার। যখনই পর্দায় জাহাঙ্গীরের কাহিনী দেখে দর্শক অনেক কষ্ট পাবে, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সেটাকে হালকা মেজাজি করে তোলা কিংবা দম ফাটানো হাসির মুহূর্ত দিয়ে পরিবেশন করার কারণে সিনেমার কোনো অর্ধই দর্শককে ঝিমিয়ে দেয় না।

হাস্যরসাত্মক সব সংলাপের সঙ্গে দারুণ কমিক টাইমিং এ সিনেমার সব থেকে বড় শক্তি। তানিম নূর-স্বাধীন জুটির পূর্ববর্তী কাজ ‘কাইজার’-এও আশি-নব্বইয়ের দশক এসেছিল চড়া দাগে। এইচ হান্ড্রেড মোটরবাইক, রেডলিফ কলম, ভিডিও ক্যাসেট ভাড়া নেয়া, আর্টসেল, বলিউডের গান—সব মিলিয়ে উৎসব যেন নব্বইয়ের স্মৃতি-বিস্মৃতির খসে যাওয়া পাতা। ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’, ‘পরদেশ’, ‘আকেলে হাম আকেলে তুম’, ‘রাজা হিন্দুস্তানি’, ‘দিওয়ানা, ‘ইশক’, ‘বেসিক ইন্সটিংকট’, ‘শোলে’, জনপ্রিয় মধুমিতা হল আর ‘আয়না’, ‘আগুন’-এর মতো অজস্র সিনেমার কথা বারবার এসেছে। মোহাম্মদপুরের বিহারিদের দুরবস্থার কথাও বাদ পড়েনি। সমস্ত গল্পটাকে একদম সময়ের আয়না করে তুলতে জরুরি ছিল একজন যত্নবান দক্ষ সিনেমাটোগ্রাফারের। ‘আয়নাবাজি’খ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার রাশেদ জামানের ক্যামেরায় রেকর্ড হয়েছে চালচিত্রের এসব খুঁটিনাটি। আর্টসেলের ‘ধূসর সময়’, লেভেল ফাইভের ‘তুমি’ গান দুটো বাড়তি এক শেড রঙ জুড়ে দিয়েছে মানানসই ক্যানভাসে।

সাধারণত মাল্টিস্টারার সিনেমায় চাঁদের হাট বসে। মানুষ শুধু কাস্টিংয়ের তোড়ে সিনেমা দেখতে যায়। ইদানীং মেয়াদোত্তীর্ণ অতি ব্যবহারে জীর্ণ বাসি কৌতুকগুলোর কারণে এসব কেঁচিয়ে যায় হরহামেশাই। চাঁদের হাট হয়েও ব্যতিক্রমী উৎসব মনে দাগ ফেলতে সক্ষম এর সারল্যের জন্য। তারিক আনাম খান, আফসানা মিমি, অপি করিম, জয়া আহসান, চঞ্চল চৌধুরী, ইন্তেখাব দিনার, সৌম্য জ্যোতি, সাদিয়া আয়মান, সুনেহরার মতো এক ঝাঁক তারকা নিজেদের জায়গায় যথাযথ অভিনয় করেছেন।

তবে সব আলো কেড়ে নিয়েছেন জাহিদ হাসান। তার অনায়াস ভঙ্গিতে যেকোনো আবেগকে প্রকাশ করার ক্ষমতা সহজাত। তিন ভূতের চরিত্রে জয়া-চঞ্চল-অপির আত্মপঁচানিমূলক (!) দৃশ্যগুলো হলভর্তি দর্শককে হাসিয়েছে। দিন শেষে উৎসবের মতো সিনেমাগুলোই তো আমাদের বুঝিয়ে দেয়, জীবনে আমরা কেউই আসলে প্রধান চরিত্র নই। আমরা সবাই সবার জীবনের পার্শ্বচরিত্র। পরিবার ছাড়া তাই আমাদের উৎসবও জমে না।