শাব্দিক বা পারিভাষিক অর্থে দৃশ্যকাব্য হলো নাটক। একই সঙ্গে পড়া ও দেখা যায় বলে নাটককে দৃশ্যকাব্য বলা হয়। কিন্তু চলচ্চিত্র শুরু হওয়ার পর বহু চলচ্চিত্রকার ক্যামেরায় তোলা দৃশ্যকে কাব্যিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। এ তালিকায় তারকোভস্কি, মাজিদ মাজিদি, আব্বাস কিয়েরোস্তামি, সত্যজিৎ রায়, আকিরা কুরোসাওয়া, বেলা তারসহ বহু নাম আসবে। ওটিটির যুগে চলচ্চিত্র (সিনেমা, সিরিজ, ওয়েব ফিল্ম) অনেকটাই বাণিজ্যিক ও দর্শকের মনোতুষ্টির জন্য নির্মিত। কিন্তু সেখানেই নেটফ্লিক্স তৈরি করে ফেলেছে কবিতা। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউড’ থেকে নির্মিত সিরিজটির ফ্রেমে ফ্রেমে ফুটে উঠেছে কবিতা, যা গদ্যে লিখেছিলেন গার্সিয়া মার্কেস।
১৯৬৭ সালে প্রকাশ হয় মার্কেসের উপন্যাস। বর্তমান বিশ্বে তিনি এক নামে পরিচিত। সেই সঙ্গে তার সেরা কাজ হিসেবে পরিচিত ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউড’। মাকোন্দো নামের জনপদের যে ইতিহাস গেঁথেছেন মার্কেস, তাকে জাদুবাস্তবতার সেরা কাজ বলা হয়। সে কারণেই এ উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব নয় বলে মনে করতেন অনেকে। নেটফ্লিক্স তা সফলভাবে করে দেখাল।
মার্কেসের উপন্যাস ছিল মাকোন্দোকে নিয়ে। সিরিজও মাকোন্দোকে নিয়েই, তবে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ বা প্রধান হয়ে ওঠেন উরসুলা। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার স্ত্রী শুরু থেকেই বুয়েন্দিয়া পরিবারের জন্য খুঁটি হয়ে ছিলেন। একটা সময় তিনি মাকোন্দোর প্রধান হয়ে ওঠেন, যদিও মাকোন্দো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া।
অ্যালেক্স গার্সিয়া লোপেজ ও লরা মোরা পরিচালনা করেছেন সিরিজটি। সার্বিক সহায়তা ও প্রযোজনায় নেটফ্লিক্স। সিরিজে প্রথমেই দৃষ্টি কাড়বে তরুণ হোসে আর্কাদিও ও উরসুলা। তাদের বিয়ে থেকে সিরিজের শুরু। এরপর পুরনো বসতি ছেড়ে আর্কাদিওর সমুদ্র সন্ধান এবং শেষ পর্যন্ত জলার পাশে এক জায়গায় নগর স্থাপন। স্বপ্নে পাওয়া সে জনপদ বা গ্রামের নাম মাকোন্দো।
সিরিজের গল্প বলার ধরনে ন্যারেশন এনে সহজ করা হয়েছে দর্শকের জন্য। কেননা মার্কেসের ম্যাজিক রিয়ালিজম পর্দায় আনলে অনেক ক্ষেত্রেই দর্শকের জন্য কঠিন হয়ে যেত। সেখানেই মার্কেসভক্তদের একটা সন্দেহ ছিল যে মার্কেসের উপন্যাসকে কতটা তুলে ধরতে পারবে সিরিজ। সে বিচার একেকজনের কাছে একেক রকম হবে। কিন্তু জিপসিদের আসা, চুম্বকের ক্ষমতা নিয়ে হোসো আর্কাদিওর আগ্রহ, তাদের পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত কু-সংস্কার উঠে এসেছে। সেখানে মার্কেসের মাকোন্দোকে খুঁজে পাবেন তার পাঠকরা।
সেট ডিজাইনের কথাও সেখানে বলতে হয়। এমনভাবে পুরনো মাকোন্দোকে তৈরি করা হয়েছে যে দর্শক বুঝবেন, একটা প্রায় যাযাবর কিছু লোক বসতি স্থাপন করেছে। এরপর সময়ের সঙ্গে মাকোন্দোর অগ্রগতি হয়েছে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার সন্ধানী মানস আর উরসুলার চেষ্টায় তা সম্ভব হয়েছে। তাদের মাকোন্দো এমন এক জনপদ যেখানে কোনো বিভেদ নেই। সব মানুষই সমান। ধর্মের বেড়াজাল নেই। কিন্তু এক সময় তার সবই আসে আর বদলে যায় মাকোন্দো। বদলের সে ইতিহাস, হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার মানসিক ভারসাম্য হারানোর মধ্য দিয়ে তুলে রাখা হলো এ সিরিজে। সে জায়গায় নির্মাতাদের পাশাপাশি কৃতিত্ব পাবেন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা।
নেটফ্লিক্সের সিরিজের গল্পটা উরসুলার। তরুণী উরসুলার চরিত্রে সুজানা মোরেলস দারুণ, তবে দৃঢ় চরিত্রের অভিনয় করেছেন বয়স্ক উরসুলার চরিত্রে মাররেয়দা সোতো। তিনি একাই যেন একদিকে বুয়েন্দিয়া পরিবারের খুঁটি আর শেষ পর্যন্ত মাকোন্দোর ঢাল। তার আত্মমর্যাদা, শ্রম, সংসারী মনোভাব তাকে মাকোন্দো না কেবল, এ ভূমিরই একজন হিসেবে মনে হবে। অন্যদিকে হোসে আর্কাদিও সংসারে থেকেও যাযাবর। ভোলাভালা মানুষ। একটা সময় থেকে চেস্টনাট গাছের তলায় বন্দি, কিন্তু মন তার সারা পৃথিবী ভ্রমণ করে এল!
সিরিজের একটা ভালো দিক হলো সিরিজ যত আগায়, চরিত্রের অভিনেতাদের তত বেশি পরিণত লাগে। তরুণ হোসে আর্কাদিওর চরিত্রে মার্কো আন্তোনিওর প্রাণোচ্ছল, উদ্যমী মনোভাব দেখে মনে হবে এমনই স্বাপ্নিক মানুষ প্রয়োজন নতুন কোনো জনপদ তৈরিতে। সে হোসে আর্কাদিও মধ্যবয়সী অবস্থায় গেলে তাকে বিরক্ত লাগে। কিন্তু তারপর চেস্টনাট গাছের তলায় হোসে আর্কাদিও আমাদের আরেকটা দুনিয়ার সন্ধান দেয়।৷ মনে হয়, প্রাচীন কোনো পুরুষ তিনি। মেলকিয়াদেসের চেয়েও প্রাচীন। এ চরিত্রে অভিনয় করা দিয়োগো ভাস্কোয়েজকেও খুব পরিচিত মনে হবে। আমাদের পিতা, পিতামহের মতো। মেলকিয়াদেসের কথা না বললেই না। রহস্যপুরুষ মেলকিয়াদেস। হোসে আর্কাদিওর বন্ধু মেলকিয়াদেস। তার বেলায় কেবল ‘আহা মেলকিয়াদেস!’ দিয়েই প্রকাশ করতে হয়।
হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউডকে অনেকে কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার গল্প বলেই মনে করে। সিরিজে অরেলিয়ানো ধীরে ধীরে পরিণত হয় আর শেষ পর্যন্ত ভাবালু তরুণ পরিণত হয় পাত্থরদিল সংগ্রামীতে। ক্লদিও কাতানো সেখানে একটা সময় দর্শককে উদ্দীপ্ত করবেন। তাকে নিয়ে এক পর্যায়ে দর্শকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হবে। মাকোন্দো বা অরেলিয়ানোর সংগ্রাম, লাল নীল দলের ভজঘটের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় যেকোনো দেশের ‘বিপ্লব’কে। সেখানে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড়িয়ে বাবার সঙ্গে বরফ দেখার কথা স্মরণ করা অরেলিয়ানোর সঙ্গে মাকোন্দো আক্রমণ করা অরেলিয়ানোর অনেক দূরত্ব। তিনি তখন আর রেমেদিওসকে ভালোবাসা সেই একাকী তরুণ না। জীবন তাকে করেছে ইস্পাত কঠিন। উরসুলাও চিনতে পারেন না প্রিয় পুত্রকে।
টেস্টনাট গাছের তলায় হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া, কলম্বিয়ায় হঠাৎ বৃষ্টি, প্রেম ও কামকে উপস্থাপনে অভিনয়, সেট নির্মাণ, গল্প বলা আর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ব্যবহার মিলিয়ে এ সিরিজ দর্শককে গভীরভাবে স্পর্শ করে এবং কখনো কখনো স্তব্ধ করে।










