আজ শুরু হচ্ছে ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। ‘নান্দনিক চলচ্চিত্র, মননশীল দর্শক, আলোকিত সমাজ’—এ স্লোগানকে সামনে রেখে রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদের আয়োজনে নয় দিনব্যাপী এ উৎসব চলবে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। এবারের উৎসবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯১টি দেশ থেকে নির্বাচিত পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের মোট ২৪৫টি সিনেমা প্রদর্শিত হবে। প্রতি বছরের মতো এবারো বাংলাদেশী কয়েকজন চলচ্চিত্রকর্মী জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবারের উৎসবে। বণিক বার্তার সঙ্গে তারা কথা বলেছেন উৎসবের নানা দিক নিয়ে। তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন অহিদুর রহমান
‘জুরি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া আমার জন্য সম্মানজনক’
একজন জুরি ও চলচ্চিত্রকর্মী হিসেবে ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবকে ঘিরে চলচ্চিত্রকর্মীদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখে আমি আশাবাদী—এবারো একটি সফল উৎসব হবে।
আহমেদ মুজতবা জামাল, আমাদের সবার প্রিয় শোভন ভাই, বছরের পর বছর ধরে এ কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল উৎসবটি প্রায় একক প্রচেষ্টায় আয়োজন করে চলেছেন। তাদের এ অবদান সত্যিই অতুলনীয়।
এবার আমি বাংলাদেশ নারী পরিচালক বিভাগে জুরি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছি, যা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি, যা থেকে অনেক কিছু শেখার আশা রাখছি।
উৎসব চলাকালীন আমরা সব জুরি একসঙ্গে বসে সিনেমাগুলো দেখব এবং বিস্তারিত আলোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিনেমা মূল্যায়ন করব। বাংলাদেশ নারী পরিচালক বিভাগের সিনেমাগুলো উৎসব কমিটির নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী বিচার করা হবে।
আমি বলব, বাংলাদেশে কনটেন্ট নির্মাণে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো তুলনামূলক কম। তবে তাদের অবস্থান ও চ্যালেঞ্জ পুরুষ নির্মাতাদের সঙ্গে খুব বেশি ভিন্ন নয়। নারীদের কাজের মান, প্রতিভা ও অবদানও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
‘এ পরিস্থিতিতে উৎসবটি হচ্ছে এটাই আনন্দের’
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র উৎসব হলো ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। এ উৎসবকে এ দেশের মানুষ যেমন অনুসরণ করেন, তেমনি বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকেও এর খোঁজখবর রাখা হয়। ২৪তম আসরে আমি ওয়াইড অ্যাঙ্গেল সেকশনের জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমার সঙ্গে রয়েছেন পলিনা পিদুবনা, যিনি ইউক্রেনের ফিল্মমেকার ও আর্টিস্ট।
প্রতি বছর আমরা চেষ্টা করি উৎসবটিকে একটি মিলনমেলায় পরিণত করতে। এ বছরও কিছু চ্যালেঞ্জ ছিল, কিন্তু ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর আহমেদ মুজতবা জামালের দৃঢ়তার কারণে সেগুলো পার হওয়া সম্ভব হয়েছে। ৩৩ বছর ধরে তিনি উৎসবকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সফল হয়েছেন। অনেক বাধাবিপত্তি থাকলেও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে উৎসবটি সম্ভব হচ্ছে—এটাই আমাদের আনন্দের বিষয়। ওয়াইড অ্যাঙ্গেল বিভাগের জুরি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়াটা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও সম্মানের। এর আগে আমি দুইবার ফিপ্রেসি জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এবারের স্বতন্ত্র বিভাগে জুরি হওয়াও তাই আমার কাছে বিশেষ। ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে সাধারণত কম আলোচিত, কিন্তু এখানে চমৎকার সিনেমা কিউরেট করা হয়। উৎসব চলাকালীন আমরা সিনেমা দেখি এবং জুরি মিটিংয়ে একত্র হয়ে আলোচনা করি, যাতে সেরা সিনেমা নির্বাচন করা যায়। আমি সর্বাধিক গুরুত্ব দিই সিনেমার বক্তব্যকে।
‘স্পটলাইটে যাওয়ার যোগ্যতা রাখে, এমন সিনেমাকেই বেছে নেব’
এ বছরের ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবকে একজন জুরি হিসেবে আমি খুব ভালোভাবেই দেখছি। গত বছর আমরা রাজনৈতিকভাবে বেশ অস্থির সময় পার করেছি। নানা ধরনের বাধা ছিল আমাদের সামনে। সেসব বাধা পেরিয়েও এ বছর উৎসবটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তাও যথেষ্ট বড় পরিসরে। দেশের বাইরে থেকে অতিথি ও জুরিরাও আসছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আগের বছরের তুলনায় আমাদের সিনেমার সংখ্যা বা মান কোনোটাই কমেনি। বাংলাদেশ প্যানোরোমা বিভাগে এবার আমি চতুর্থবারের মতো জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। বিভাগটির প্রতি দর্শকের আলাদা নজর থাকে, কারণ এখানে বাংলাদেশের সিনেমাগুলো প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এ বিভাগে বিচার করার ক্ষেত্রে আমি বেশ দায়িত্বশীল থাকি। যদিও আসলে সব বিভাগেই একই গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা হয়। আমাদের বিচার প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে করা হয়। জুরিরা একসঙ্গে বসে সিনেমা দেখেন এবং এখানে ফেস্টিভ্যাল কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ থাকে না। উৎসব চলাকালীন সময়ে আমরা একটি নির্দিষ্ট স্ক্রিনিং রুমে বড় পর্দায় সিনেমাগুলো দেখি। সে স্ক্রিনিংয়ে শুধু জুরি সদস্যরাই উপস্থিত থাকেন, অন্য কেউ থাকেন না। সিনেমা বিচারের ক্ষেত্রে আমাদের মানদণ্ড নির্ধারণ হয় চলচ্চিত্র সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতা, বোঝাপড়া ও শেখা বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে। যে সিনেমা সবচেয়ে বেশি স্পটলাইটে যাওয়ার যোগ্যতা রাখে, এমন সিনেমাকেই আমরা নির্বাচন করার চেষ্টা করি।
‘মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমরা সিনেমার বিষয়বস্তুকে গুরুত্ব দিই’
ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব প্রতি বছরের মতো এবারো অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের আয়োজনে বিশ্বের ৯১টি দেশ থেকে নির্বাচিত পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য মিলিয়ে মোট ২৪৫টি সিনেমা প্রদর্শিত হবে। দেশী ও বিদেশী অভিজ্ঞ জুরিরা এসব সিনেমা দেখবেন এবং বিচার করবেন। যারা জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তারা সবাই দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত এবং সিনেমা মূল্যায়নে অভিজ্ঞ। বিদেশ থেকে আসা জুরিরাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে দক্ষ ও অভিজ্ঞ চলচ্চিত্রকর্মী।
এবারের উৎসবে বাংলাদেশ প্যানোরোমা বিভাগে জুরি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি আমি। আগেও একাধিকবার জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। আমাদের সবসময়ই চেষ্টা থাকে, যেন বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হয়।
সিনেমা নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলতে গেলে, প্রতি বছর উৎসব শেষ হওয়ার পর পরই পরবর্তী বছরের প্রস্তুতি শুরু হয়। সারা বছর ধরে জমা পড়া সিনেমাগুলো থেকে বাছাই ও নির্বাচনের মাধ্যমে নির্দিষ্টসংখ্যক সিনেমা চূড়ান্ত করা হয়। আজ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। আমি আজ সকাল থেকেই সিনেমা দেখা শুরু করছি। সিনেমা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমরা প্রথমেই কনটেন্ট বা বিষয়বস্তুকে গুরুত্ব দিই। সিনেমার বক্তব্য জনকল্যাণমূলক কিনা, সামাজিক, ধর্মীয় কিংবা শিশুদের জন্য উপযোগী কোনো বার্তা আছে কিনা—এসব বিষয় আগে বিবেচনায় আসে।










