বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ। তার ১৩৫তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে সারা দেশে শুরু হয়েছে স্মরণোৎসব ও মেলা। এ বছরই প্রথমবার রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজন করা হলো এ স্মরণোৎসব। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে গত শুক্রবার উদ্বোধন করা হয় তিনদিনব্যাপী স্মরণোৎসবের। আগামীকাল শেষ হবে আয়োজনটি।
স্মরণোৎসবে কুষ্টিয়ায় মূল আয়োজনের পাশাপাশি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাউল সাঁইয়ের গান, দর্শন ও জীবনাদর্শ তুলে ধরতে বিশেষ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গতকাল অনুষ্ঠিত হয় বর্ণিল লালন সংগীত উৎসব। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে সম্পন্ন হয় এ আয়োজন।
এ উৎসবের মাধ্যমে বাউলধর্ম, মানবতা ও দর্শনের প্রতীক লালন সাঁইয়ের স্মৃতি ধরে রাখার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তার গান ও দর্শন ছড়িয়ে দেয়ার বিশেষ চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিল্পী, সাধক ও লালনপ্রেমীরা রাজধানীতে উপস্থিত হয়ে উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

বিকাল থেকেই দর্শক-শ্রোতাদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মূল মঞ্চ এলাকা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মূল মঞ্চ এলাকায় বিভিন্ন স্টলে লালন ভাবনায় পুরোপুরি সাজানো ছিল। প্রবেশপথ থেকে দর্শকরা দেখতে পান বাউল চেতনার প্রতীকী সাজসজ্জা, লালনের জীবন ও দর্শনভিত্তিক প্রদর্শনী এবং ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের প্রদর্শনী।
এছাড়া উৎসব প্রাঙ্গণে ছিল বাংলা একাডেমি কর্তৃক বইয়ের স্টল, বাউল ভোজ স্টল, ভ্রাম্যমাণ কিছু খাবারের স্টল। গান, দর্শন ও সাধনার এ অনন্য মেলবন্ধনে বিকাল থেকেই পরিণত হয় বাউল সাধনার মহামিলনে। লালনভক্তরা তার গান ও লালন স্মরণে এ আয়োজনে আসেন। পাশাপাশি সংগীতের ভক্তরাও ভিড় করেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। নানা বয়সের মানুষের উপস্থিতি ছিল সেখানে।
সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হয় অনুষ্ঠানের মূল আয়োজন। শুরুতেই লালনের ওপর একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। এরপর এ্যানি বৈরাগী ও শুখলাল বৈরাগীর গানের মাধ্যমে গান পরিবেশন শুরু হয়। গানের তালে তালে উপস্থিত দর্শক শ্রোতারা আওয়াজ তুলতে থাকে।
এরপর একে একে মঞ্চে আসেন লালন শিল্পী সূচনা শেলী, ফাহমিদা আহমেদ শিফা, বাউলা ব্যান্ড, পথিক নবী অ্যান্ড টিম ক্রিয়েটিভ, অপরূপ রাহী, সমগীত, নীরব অ্যান্ড বাউল দলের দীনা মণ্ডল, মুজিব পরদেশী, কানিজ খন্দকার মিতু এবং সাগর বাউল। এরপর আরো গান পরিবেশন করেন বেঙ্গল সিম্ফনির শিল্পীরা—আলেয়া বেগম, শিবলু, মাখন দেওয়ান, মার্থা এবং টুনটুন বাউল।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘লালন’-এর সংগীত পরিবেশনা। মঞ্চে উঠে ব্যান্ডটি পরিবেশন করে একের পর এক জনপ্রিয় লালনগীতি—যার প্রতিটি সুরে প্রতিফলিত হয় মানবতার বাণী ও আধ্যাত্মিক ভাব। দর্শকরা তাদের প্রাণবন্ত পরিবেশনায় গান, সুর ও ছন্দে হারিয়ে যান বাউল দর্শনের মরমি আবহে।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, লালন উৎসব কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়। এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্য, দর্শন এবং মানবধর্মের ধারাবাহিকতাকে ধরে রাখার এক প্রয়াস। তারা বলেন, ঢাকার পাশাপাশি কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায়ও চলছে মূল লালন উৎসব। রাজধানীর এ আয়োজন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে লালনের গান, দর্শন ও চেতনা ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করবে।
উৎসবের আয়োজন শেষে দর্শকরা জানান, এমন একটি উদ্যোগ লালন সাঁইয়ের দর্শন, মানবধর্ম ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি করবে।










