‘দ্য শার্ক ইজ নট ওয়ার্কিং’—কয়েক সপ্তাহ ধরে এ কথাই শুনছিল কাস্ট অ্যান্ড ক্রু। ঘটনাটি স্টিভেন স্পিলবার্গের দ্বিতীয় সিনেমা ‘জওস’-এর সময়কার। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পায় সিনেমাটি। হাঙর নিয়ে নির্মিত এ সিনেমার জন্য বেশ কয়েকটি অ্যানিমেটিক (অ্যানিমেশনের জন্য তৈরি ভৌত অবয়ব) হাঙর তৈরি করা হয়েছিল। স্পিলবার্গের বয়স তখন মাত্র ২৭ বছর। নির্মাণ করেছেন একটিমাত্র থিয়েট্রিক্যাল ফিচার ফিল্ম। মাথার ওপর নানা চিন্তা। একটা হাঙর নষ্ট হলে আরো একটা দিনের অপচয়। কিন্তু সেটা ঘটেছে। আর সব মিলিয়ে প্রাথমিক পরিকল্পনা থেকে ১০০ দিন পিছিয়ে গিয়েছিল আর বাজেট গিয়ে ঠেকেছিল সে সময় ৮০ লাখ ডলারে।
এ সিনেমায় শেরিফের ডেপুটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জেফ্রি ক্র্যামার। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাসই করতে পারিনি সিনেমাটি শেষ করে মুক্তি দিতে পারব। মনে হয়েছিল একটা সময় বিরক্ত হয়ে স্টুডিও আমাদের কাজ বন্ধ করে দেবে।’
পিটার বেঙ্কলির বেস্টসেলিং উপন্যাস থেকে সিনেমাটি নির্মাণ করছিলেন স্পিলবার্গ। তিনি বিশ্বাস করতেন, উপন্যাস থেকে সিনেমা নির্মাণ করা সম্ভব তার পক্ষে। তিনি উপন্যাসের সঙ্গে মিল রেখে সিনেমাটি নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। স্টুডিও, বাজেটের চাপের পরও তিনি ভেবেছিলেন নিজের পরিকল্পনা মতোই সিনেমাটি নির্মাণ করবেন।

সিনেমাটির সহলেখক কার্ল গোটলিব বলেন, ‘কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হয়ে যাচ্ছিল কিন্তু স্টিভেন তার মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজটা করে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।’
সিনেমাটি তিনি সরাসরি পানিতে গিয়েই নির্মাণ করেছিলেন। তার মনে হয়েছিল এর ফলে বাস্তবের কাছাকাছি থাকবে সিনেমাটি। কিন্তু তাতে শুটিংয়ে সমস্যা বেড়েছিল। নৌকার ওপর জিনিসপত্রের ভার বেশি হয়ে শট সম্পূর্ণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর কাস্ট ও ক্রুর অনেকেই ‘সি-সিকনেস’-এর কবলে পড়েন। ১৯৭৫ সালে সিনেমাটি মুক্তির পর স্পিলবার্গ নিজেও টাইম ম্যাগাজিনকে বলেছিলেন, ‘জওস কখনো তৈরি হবে আমি বিশ্বাস করিনি। আমার মনে হচ্ছিল এটা একটা অসম্ভব কাজ।’
নির্মাণে এত জটিলতার পর সিনেমাটি ব্লকবাস্টার হয়েছিল। মুক্তির পর প্রাথমিকভাবে সিনেমাটি আয় করেছিল ২৬ কোটি ডলার। ৫০ বছর পরও সিনেমাটি দেখেন বহু দর্শক। এরপর একে একে স্পিলবার্গ তৈরি করেছিলেন ব্যবসাসফল বহু সিনেমা। বলা হয় জওসের মতো সিনেমাই পথ দেখিয়েছিল স্টার ওয়ার্স, জুরাসিক পার্ক, অ্যাভেঞ্জার্সের মতো বড় পরিসরের সিনেমার।

দি হরর সেকশনের প্রতিষ্ঠাতা ও হোস্টেল সিরিজের নির্মাতা এলি রথ বলেন, ‘সিনেমাটি (জওস) মূলত সিনেমাকে বদলে দিয়েছিল। সিনেমার একটা নতুন ভাষা তৈরি করেছিলেন স্পিলবার্গ।’
জওস নিয়ে স্পিলবার্গ রীতিমতো হোমওয়ার্ক করেছিলেন। ভারতীয় সিনেমার কিংবদন্তি সত্যজিৎ রায় সিনেমা নির্মাণের আগে এর পরিকল্পনা, ডিজাইন করতেন। স্কেচ তৈরি করতেন। জওস নিয়ে একইভাবে এগিয়েছিলেন স্পিলবার্গ। তিনি স্কেচ করে দৃশ্য সাজিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে এ সিনেমার সম্পাদনা, সংগীত, ক্যামেরার ব্যবহারে নতুন ধারার জন্ম দেয়।
স্টিভেন সদেনবার্গ এ নিয়ে বলেন, ‘স্পিলবার্গ মোটামুটি একটা দুঃস্বপ্ন পার করে এ সিনেমার নির্মাণ শেষ করেছিলেন। আমার মনে হয় স্পিলবার্গ এ সিনেমা না বানালে সিনেমাটি তৈরিই হতো না। একটা ক্ল্যাসিক দেখা হতো না আমাদের কারো।’
এ কথা নতুন করে বলার কিছু নেই যে জওস মুক্তির পর থেকেই এটি সিনেমা নির্মাতাদের অনুপ্রাণিত করে গেছে। ব্লুমহাউজ কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা জেসন ব্লাম বলেন, ‘যখন নির্মাতারা নতুন কোনো চিন্তা বা সিনেমার পরিকল্পনা নিয়ে আসেন, জওস হয় তাদের রেফারেন্স।’
তবে সিনেমাটি নির্মাণের সময় অনেকেই আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। সিনেমার একজন প্রযোজক ডেভিড ব্রাউন সে সময় ভ্যারাইটিকে বলেছিলেন, ‘আমরা যেখানেই যাচ্ছিলাম সবাই আমাদের দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। বারবার বলছিল তারা আশা করেন জওস তার দুর্দশা কাটিয়ে উঠবে।’
কিন্তু এর পরেই তৈরি হয়েছিল ইতিহাস। সিনেমাটি দেখার জন্য লাইন লেগেছিল। ব্যবসাসফল হওয়ার পাশাপাশি জওস হয়ে উঠেছিল সিনেমার নতুন ভাষা।










