ঢাকা শহর এসে যার স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল, মন যার ছোট্ট তরী হয়েও ভালোবাসার সাগর পাড়ি দিতে চেয়েছিল,"‘আমি যেমন আছি তেমন রব’র মতোই হয়তো থাকতে চেয়েছিলেন।

‘চলে আমার সাইকেল হাওয়ার বেগে উইড়া উইড়া’, ‘বাবারে বাবা কই দিলা বিয়া’, ‘ও মিষ্টি ভাবিরে’সহ এমন অসংখ্য গান ও সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন, একই সঙ্গে যিনি বাংলা চলচ্চিত্রের সফল অধ্যায় সমৃদ্ধ করেছেন, তিনি হলেন চিত্রনায়িকা অঞ্জনা। বাংলাদেশের সিনেমায় একজন সর্বজনবিদিত নায়িকা ছিলেন তিনি। সোনালি দিনের চলচ্চিত্রের অন্যতম অভিনেত্রী অঞ্জনা। ডাগর চোখের এ অভিনেত্রী নিজ যোগ্যতায় ঢালিউডে কাজ করেছেন। তার সময়ে শাবানা, ববিতা, কবরী, অলিভিয়াদের মতো প্রভাব বিস্তারকারী তারকারা ছিলেন। তাদের মধ্য থেকেও নিজের যোগ্যতায় দর্শক মন জয় করেছেন। সহজাত অভিনয়ের পাশাপাশি নাচেও ছিলেন পারদর্শী।

একসময়ের এ জনপ্রিয় অভিনেত্রী জীবনের সব হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে অসংখ্য দর্শক শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১টা ১০ মিনিটে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে যান।

গণমাধ্যমকে অঞ্জনার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর। মৃত্যুকালে অঞ্জনার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। তিনি দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন।

মৃত্যুর আগে তিন সপ্তাহ ধরে অসুস্থ ছিলেন এ অভিনেত্রী। শুরুতে জ্বর ছিল। সারা শরীর কেঁপে জ্বর আসত। একটা সময় ওষুধ খেয়েও কাজ হচ্ছিল না। শেষে জানা যায়, তার রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এরপর অঞ্জনাকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে কয়েকদিন তাকে রাখা হয় সিসিইউতে।

সেখানকার চিকিৎসায় শারীরিক অবস্থার আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ায় হাসপাতাল বদলে গত বুধবার অঞ্জনাকে নেয়া হয় বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় ওই রাতেই তাকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়। ভেন্টিলেশনে থাকা অবস্থায় তার অবস্থার কখনো উন্নতি, কখনো অবনতি হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত চলেই গেলেন তিনি।

অঞ্জনার জন্ম ২৭ জুন ১৯৬৫। চাঁদপুর জেলায় বাড়ি। নৃত্যশিল্পী হয়ে মঞ্চে কাজ শুরু করেন। অভিনয়ে প্রথম সিনেমা ‘সেতু’, কিন্তু পর্দায় আসেন ‘দস্যু বনহুর’ সিনেমা নিয়ে। সিনেমায় অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনাও করেছেন তিনি। দস্যু বনহুর সিনেমাটিতে তার বিপরীতে ছিলেন সোহেল রানা। এরপর একে একে উপহার দিতে থাকেন দর্শকপ্রিয় বেশ কয়েকটি সিনেমা।

এছাড়া অভিনয় করেন ‘মাটির মায়া’, ‘অশিক্ষিত’, ‘চোখের মণি’, ‘সুখের সংসার’, ‘জিঞ্জির’, ‘অংশীদার’, ‘আনারকলি’, ‘বিচারপতি’, ‘পরীণিতা’ ইত্যাদি বাণিজ্যিক সফল সিনেমায়।

অঞ্জনা অভিনীত সিনেমার বেশ কয়েকটি বিখ্যাত গান রয়েছে, যা আজও দর্শকের মন কাড়ে।

‘অশিক্ষিত’ সিনেমা ঢাকা শহর আইসা আমার আশা ফুরাইছে।

‘নান্টু ঘটক’ সিনেমা চলে আমার সাইকেল হাওয়ার বেগে উইড়া উইড়া...

‘রজনীগন্ধা’ সিনেমায় মিষ্টি ভাবি রে...

এ গানগুলো দর্শক- শ্রোতাদের মনে গেঁথে থাকবে। অঞ্জনার মধ্যে সৌন্দর্য ও অভিনয়গুণ দুটোই ছিল। তার সময়ের প্রথম সারির নায়কদের সঙ্গেই কাজ করেছেন তিনি। লাক্সের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবেও দেখা গেছে তাকে। এশিয়া মহাদেশীয় নৃত্য প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন এ অভিনেত্রী।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে হরর ঘরানার যে কয়েকটি সিনেমা হয়েছে, এর মধ্যে সাদাকালো সময়ে কাজী হায়াৎ নির্মিত অসাধারণ হরর সিনেমা ‘রাজবাড়ি’র নায়িকা ছিলেন অঞ্জনা। ডাবল রোলের এ সিনেমায় তার অভিনয় অসাধারণ ছিল। সিনেমাটিতে তার হরিণী চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে। চরিত্রটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নায়করাজ রাজ্জাকের সঙ্গে প্রায় ২৭টি সিনেমার মধ্যে ‘অভিযান’ সিনেমাটি ছিল তার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী কাজ। জসিম প্রযোজিত ‘ভাইজান’ সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার চরিত্র। ভারতের সুপারস্টার মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে ‘অর্জুন’ সিনেমায় অভিনয় করে প্রশংসিত হন তিনি। যৌথ প্রযোজনার একাধিক সিনেমায় দেখা গেছে তাকে, এমনকি বিদেশে চিত্রায়িত বিগ বাজেটের সিনেমাগুলোয়ও তাকে দেখা যায়।

বাংলাদেশ ছাড়াও তিনি অভিনয় করেছেন ১৩টি ভাষার সিনেমায়।

দেশের বাইরে মিঠুন (ভারত), নাদিম, জাভেদ শেখ, ফয়সাল (পাকিস্তান), শিবশ্রেষ্ঠা (নেপাল) একাধিক নায়কদের সঙ্গে অভিনয় করেছেন তিনি।

অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে অঞ্জনা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, আন্তর্জাতিক পুরস্কার, একাধিক জাতীয় স্বর্ণপদক ও বাচসাস পুরস্কার পেয়েছেন কয়েকবার। নৃত্যশিল্পী হিসেবেও তিনি পেয়েছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক স্বীকৃতি। ‘পরিণীতা’ ও ‘গাঙচিল’-এ অভিনয়ের জন্য দুবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন। এছাড়া বাচসাস পুরস্কার পান তিনবার।

এ গুণী অভিনেত্রীর প্রয়াণে চলচ্চিত্র পাড়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শনিবার বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) তার প্রথম জানাজা শেষে বেলা ২টার দিকে তার মরদেহ চ্যানেল আইয়ের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। বেলা ২টা ১৫ মিনিটে চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে তার দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন হয়। এরপর রাজধানীর বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন অঞ্জনা রহমান।