খুবই সাধারণ বিষয় কিন্তু তার পরও মনে নানা প্রশ্ন উঁকি দেয়া শুরু হবে: ছোট্ট একটা পাখি, পা বাঁধা দাঁড়ের সঙ্গে। গোল্ডফিঞ্চ—এ ছবি আঁকা হয়েছিল সতেরো শতকে, এঁকেছিলেন শিল্পী কারেল ফেবরিতিওস। এটি এখন বিশ্বের মূল্যবান বিখ্যাত চিত্রশিল্পের একটি।

এ গোল্ডফিঞ্চ আবার আলোচনায় এসেছে পুলিত্জারজয়ী উপন্যাসের কারণে, যার নামও গোল্ডফিঞ্চ। উপন্যাসে গোল্ডফিঞ্চ চিত্রকর্ম চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রভাব ফেলে পুরো কাহিনীতেই, কাহিনীর প্রতিটি চরিত্রে। ডোনা টারটের দি গোল্ডফিঞ্চের কথক ১৩ বছর বয়সে এ ছবি চুরি করেছিল। চুরি করা সেই ছবি তার বাকি জীবনের ঘটনার নিয়ন্ত্রক হয়ে কাজ করেছে।

গোল্ডফিঞ্চ পুলিত্জার জয়ের পর এখন রুপালি পর্দায় অর্থাত্ সেলুলয়েডেও হাজির। ছবিতে নিউইয়র্ক মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টে এক বোমা হামলায় মাকে হারায় থিওডোর ডেকার, তখন তার বয়স ছিল ১৩ বছর। মা হারানোর ঘটনায় থিওডোর কারেল ফেবরিতিওসের গোল্ডফিঞ্চ চিত্রকর্ম চুরি করে আনল। আর এই একটি চিত্রকর্ম, যা পরেও তার সব দুঃখ-বেদনা আর অপরাধের দীর্ঘ ভ্রমণের নীরব সঙ্গী। সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছে গতকালই।

তবে এ ছবিতে কারেল ফেবরিতিওসের গোল্ডফিঞ্চ চিত্রকর্ম চুরির ঘটনা ঘটলেও বাস্তবে কারেল ফেবরিতিওসের গোল্ডফিঞ্চ চিত্রকর্ম কখনই চুরি যায়নি। চুরি হয়েছে মোনালিসা, মাতিস, সেজানের ছবি। সেসব চৌর্যবৃত্তির দুঃসাহসিক ঘটনা গল্প-উপন্যাস বা চলচ্চিত্রকেও হার মানায়। দুর্ধর্ষ এসব শিল্প চুরির ঘটনার কিছু হলিউডের চিত্রনাট্যকারদের কলম হয়ে সেলুলয়েডে চিত্রিতও হয়েছে আগে, গোল্ডফিঞ্চ সে অর্থে সর্বশেষ সংযোজন।

আজকে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতিকৃতি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মোনালিসা, এখন প্যারিসের লুভ মিউজিয়ামের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা হেফাজতে রয়েছে। এর দেয়ালে ঝোলানো ফ্রেমে বন্দি মোনালিসা হাসলেও তার সামনে কয়েক পরতের স্বচ্ছ বুলেটপ্রুফ কাচ, আছে অদৃশ্য সেন্সর আর দৃশ্যমান সশস্ত্র প্রহরী। মোনালিসার এই কঠোর নিরাপত্তা আমেরিকার কেনটাকির ফোর্ট নক্সের অভেদ্য নিরাপত্তা মানের সমতুল্য প্রায়। আর আজকের এই কঠোর নিরাপত্তার পেছনে রয়েছে একটি অপরাধ কাহিনী।

১৯১১ সালের ২১ আগস্টের সকালে লুভ মিউজিয়াম বন্ধ থাকা অবস্থায় ভিনসেঞ্জো পেরুজ্জিয়া নামের এক ইতালিয়ান জাদুঘরের কর্মচারীদের ঢোকার দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। জাদুঘরের কর্মীদের মতো সাদা ঢিলেঢালা পোশাক পরনে ছিল তার, ফলে তাকে বহিরাগত হিসেবে কারোরই কোনো সন্দেহ হয়নি। মোনালিসা যেখানে ছিল, ভিনসেঞ্জো সেখানে হাজির হয়ে ফ্রেম থেকে চিত্রকর্মটি খুলে আনেন, তারপর পরনের আলখেল্লায় মোনালিসাকে জড়িয়ে, বগলতলায় করে লুভর থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। যে পথে তিনি ঢুকেছিলেন, সেই একই পথ ব্যবহার করে অনায়াসেই মোনালিসাকে নিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যান। এ ছবি খোয়া যাওয়ার ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরই মূলত অখ্যাত মোনালিসা ঘরে ঘরে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে য়ায়।

সন্দেহ করা হয়, আমেরিকার ধনকুবের জেপি মরগান এ চিত্রকর্ম চুরির অর্থ জুগিয়েছিলেন। আরেক কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসোও সন্দেহভাজন হিসেবে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েন। তবে আসল চোর, সত্যিকারের অপরাধী ভিনসেঞ্জো পেরুজ্জিয়া ততদিনে বুঝে গিয়েছিলেন এ চিত্রকর্ম বিক্রি করা তার পক্ষে প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। পেরুজ্জিয়া তখন ট্রাংকের নিচে দ্বিতীয় আরেকটা তলা যুক্ত করে মোনলিসাকে লুকিয়ে ফেলেন তার প্যারিসের বোর্ডিং হাউজে। শেষে দুই বছর পর পেরুজ্জিয়া ফ্লোরেন্সে এক আর্ট ডিলারের কাছে মোনালিসাকে বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পরে যান, গ্রেফতারের পর তার আট মাসের সাজা হয়।

মোনালিসা ফিরে আসে তার নির্দিষ্ট স্থানে, লুভ জাদুঘরে।

১৯৮৭ সালে একই পরিণতি ঘটে লু যাখদা, হেনরি মাতিসের আঁকা চিত্রকর্মের। ছবিটি স্টকহোমের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট থেকে চুরি হয়। সামনের দরজা হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে দেয়াল থেকে ছবিটি খুলে নিয়ে রক্ষীরা আসার আগেই সটকে পড়ে চোরেরা। ২৫ বছর এ চিত্রকর্মের আর হদিস মেলেনি, মাঝখানে চোরেরা জাদুঘরের কাছে চিত্রকর্মটি বিপুল দামে বিক্রির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। শেষে ২০১৩ সালে লন্ডনকেন্দ্রিক এক আর্ট ডিলার চার্লস রবার্টস বয়োবৃদ্ধ এক পোলিশ চিত্রকর্ম সংগ্রাহকের হয়ে ছবিটি বিক্রির চেষ্টা করলে এটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

সেজানের পিউটার পিচার অ্যান্ড ফ্রুটও চুরি হয়ে যাওয়ার পর দুই দশক কোনো হদিস ছিল না। এ ছবির মালিক আমেরিকার মাইকেল বাকউইনের ম্যাসাচুসেটসের বাড়ি থেকে আরো ছয়টি চিত্রকর্মের সঙ্গে সেজানের ছবিটি চুরি হয়, ১৯৭৮ সালে। প্রকৃত চোরের কাছ থেকে হাতবদলের পর তার আইনজীবী রবার্ট মারদিরোসিয়ান চিত্রকর্মগুলো বিক্রির চেষ্টায় বিশ্বের নানা স্থানে ঘুরে বেড়ান—মোনাকো থেকে জেনেভা। শেষে নিলামে তুললে আর্ট লস রেজিস্টারের (হারানো চিত্রকর্ম উদ্ধারকারী সংস্থা) হস্তক্ষেপে নিলাম স্থগিত হয়ে যায়, মাতিস প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরে আসে। ১৯৯৯ সালে বাকউইন সদবির কাছে ১৮ মিলিয়ন পাউন্ডে ছবিটি ছেড়ে দেন। রবার্ট মারদিরোসিয়ান ২০০৮ সালে দোষী সাব্যস্ত হন।

এ চুরিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী চুরি ছিল ২০টি চিত্রকর্ম চুরির ঘটনা। ১৯৯১ সালে আমস্টারডামের ভ্যান গখ জাদুঘরে ঘটে এ চুরির ঘটনা। চিত্রকর্মগুলো চোরেরা জাদুঘর থেকে বাইরে বের করে নিয়ে যেতে সফল হলেও ৩৫ মিনিটের মধ্যেই সব চিত্রকর্ম উদ্ধার করা সম্ভব হয়। দুঃখজনক হলো, তিনটি—হুইটফিল্ড ইউথ ক্রো, স্টিল লাইফ উইথ বাইবেল ও স্টিল লাইফ উইথ ফ্রুট—বাজেভাবে ছিঁড়ে য়ায়। জাদুঘরের রক্ষীসহ চারজন এ চুরির ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হয় পরে।

স্ক্রিম চিত্রকর্মের জন্য জগদ্বিখ্যাত নরোজিয়ান পেইন্টার এডভার্ড মুঙ্খ একবার নয়, পরপর দুবার চুরির শিকার হয়েছেন। পাল এঙ্গার একসময় পেশাদার ফুটবল খেলতেন, তিনি একাই মুঙ্খের দুটি ছবি চুরি করেন। মুঙ্খের দ্য ভ্যাম্পায়ার চুরি করে তিন বছর জেল খাটার পর নরওয়ের ন্যাশনাল গ্যালারি থেকে ১৯৯৪ সালে দ্য স্ক্রিম চুরি করেন পাল। এ চিত্রকর্ম চুরি করতে তার ও তার সহযোগীদের সময় লাগে মাত্র ৯০ সেকেন্ড। জানালা ভেঙে চিত্রকর্ম চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় তারা দেয়ালের যেখানে চিত্রকর্মটি ঝোলানো ছিল, সেখানে এক টুকরো কাগজ ঝুলিয়ে দিয়ে যান। তাতে লেখা ছিল ‘বাজে নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য ধন্যবাদ!’

এঙ্গার ক্যালিফোর্নিয়ান মিউজিয়ামের এক প্রতিনিধির কাছে দ্য স্ক্রিম ৭ লাখ পাউন্ডে বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়েন। সাড়ে ছয় বছরের সাজা হয় তার।

চলচ্চিত্র গোল্ডফিঞ্চ ছবি উদ্ধারের কাহিনী নয়। একটি বিখ্যাত চিত্রশিল্পকে ঘিরে এক তরুণের জীবনকাহিনী।

গতকাল মুক্তি পাওয়া গোল্ডফিঞ্চ ছবিতে অভিনয় করেছেন সারা পলসন, নিকোল কিডম্যান প্রমুখ। আর ছবির পরিচালক জন ক্রাউলি।

 

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, লোকাল, আর্ট থেফট