কিছুদিন হলো ভারতে কনটেন্ট নির্মাণ হচ্ছে স্ক্যাম নিয়ে। আগে হতো না, এমন না। তবে একটা সময় গুরুত্ব পেত আন্ডারওয়ার্ল্ড। এরপর চিটফান্ড ও নানা ছোট অপরাধ নিয়ে সিনেমা হলেও তা বেশি গুরুত্ব পায়নি। ওটিটি আসার পর অপরাধ না করে ফেঁসে যাওয়াদের নিয়ে সিরিজ হয়েছে। তবে আর্থিক জালিয়াতি নিয়ে হানসল মেহতার ‘স্ক্যাম: ১৯৯২’ সব বদলে দেয়। শেয়ারবাজারের কেলেঙ্কারি নিয়ে নির্মিত এ সিরিজে নবাগত প্রতীক গান্ধী সবাইকে অবাক করেন অভিনয় দিয়ে। এরপর আরো সিরিজ নির্মিত হয়। সে ধারায় নতুন সংযোজন ‘লাকি ভাস্কর’। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন দুলকার সালমান। থিয়েটারে মুক্তির পর থেকে প্রশংসিত সিনেমাটি ওটিটিতে স্ট্রিম শুরু হতেই আরেক দফা প্রশংসা পাচ্ছে।
গল্পটা মূলত ভাস্করের। মাগধা ব্যাংকে ক্যাশিয়ার সে। স্বপ্ন একদিন সে ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার হবে। ক্যাশিয়ার হলেও অন্য সেকশনের সহকর্মীদের সঙ্গে ভাস্করের সম্পর্ক পরিবারের মতো। সে রোজ অফিসে ঢুকে সবার খবর নেয়ার পাশাপাশি যার যে রকম সাহায্য দরকার, করে থাকে। কিন্তু ভাস্করের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না। বাবার বানানো বাড়িতে বসবাস হলেও নিয়মিত ধারকর্জ করে চলতে হয়। শ্যালকের ছেলের জন্মদিনে তার স্ত্রী সুমতি মান বাঁচায় ছেলের পুরনো খেলনা উপহার দিয়ে। ভাস্করের বাবা এককালের নামজাদা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হলেও জীবনের কশাঘাতে তিনি বাকরুদ্ধ। অবশ্য একটা সময় তিনিই ভাস্করের ত্রাণকর্তা হন, তবে তা আরো পরের গল্প।
সংসারে দুই পয়সা উপরি আয়ের জন্য ভাস্কর তার ব্যাংকের বাইরে এক ক্যাফেতে বসে ব্যাংকে আসা লোকদের আর্জি লিখে দেয়। নব্বইয়ের দশকে (এমনকি এখনো) ব্যাংকের ফরম, অ্যাপ্লিকেশন সবাই বোঝে না। সামান্য অর্থের বিনিময়ে এসব করে দিত ভাস্কর আর সাহায্য করত তার বন্ধু সাম্বা। সে মাগধা ব্যাংকের আর্দালি।
সিনেমার পরিচালক ভেঙ্কি আটলুরি। মাগধা ব্যাংকের সেট সাজাতে গিয়ে তিনি নব্বইয়ের দশককে সেখানে তুলে এনেছেন। সেই পুরনো ধারার কাঠের চেম্বার, রেজিস্ট্রার খাতা, পেট মোটা কম্পিউটার মনিটর ইত্যাদি। পিরিয়ড সিনেমার ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। কেননা গল্পের সময়ের সঙ্গে নিজেকে সহজে যুক্ত করতে পারেন দর্শক। এ সিনেমায় সেটা করেছেন ভেঙ্কি। এমনকি ভাস্কর, সুমতি, সাম্বা ও ব্যাংকের অন্যান্য কর্মচারীর পোশাক-আশাকেও সময়টা স্পষ্ট।
স্ক্যাম তাহলে কখন হলো? মূলত সিনেমার গল্পে ভাস্কর একটা সময় বাধ্য হয়েই স্ক্যাম করে। তার একটা প্রমোশন হওয়ার কথা থাকলেও অফিস-পলিটিকসের কারণে তা হয় না। এর পরই সে ছুটির দিনের আগে ব্যাংকের ভল্টে ২ লাখ টাকা জমা না দিয়ে, তা দেয় অ্যান্টনিকে। অ্যান্টনির কিছু টেলিভিশনের শিপমেন্ট আটকে ছিল বন্দরে। সেটা ওই টাকায় ছাড়িয়ে এনে তার ২০ শতাংশ লাভ দেয়া হয় ভাস্কর ও সাম্বাকে। এখান থেকেই শুরু স্ক্যামের। শুরুটা ছোট পরিসরে হলেও এরপর প্রয়োজন ও অর্থের লোভে ভাস্কর আরো বড় অংক সরাতে শুরু করে। সময়মতো তা ফেরতও দিত। মূলত ব্যাংকের অর্থ সে নিজের কাজে লাগিয়ে ব্যবসা করে ব্যাংককে সে অর্থ ফেরত দিয়েছে। কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে ছিল আরো বড় স্ক্যাম।
নব্বইয়ের দশকে ভারতের আর্থিক কেলেঙ্কারির সবচেয়ে বড় নাম হারশাদ মেহতা। লাকি ভাস্করে তার গল্পটাও আছে ছোট করে। ব্যাংক থেকে বিশেষ উপায়ে অর্থ নিত হারশাদ। লাকি ভাস্কর দেখায় সে কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল ব্যাংকেরও অনেকে। এমনকি মাগধা ব্যাংকের চেয়ারম্যান অবধি। একসময় ভাস্করকে ম্যানেজার বানানোই হয় হারশা মেহরার (সিনেমার এ নাম ব্যবহার করা হয়েছে) অ্যাকাউন্ট পরিষ্কার রাখার জন্য। কিন্তু ভাস্কর সেটা বুঝে গিয়েছিল এবং ব্যাংক তাকে নিয়ে খেলার আগে সে-ই ব্যাংককে ব্যবহার করেছিল নিজেকে বাঁচানোর পাশাপাশি নিজের ও পরিবারের জীবন সুরক্ষায়।
ভেঙ্কির এ সিনেমা হানসল মেহতার স্ক্যামের তুলনায় সরল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে হারশাদ মেহতার শেয়ারবাজার জালিয়াতি, আবদুল করিম তেলগির স্ট্যাম্প জালিয়াতিকে যুক্ত করে এ সিনেমা দেখলে একটা সময়ের আর্থিক জালিয়াতির চিত্রটা বোঝা যায়। সেই সঙ্গে ব্যাংক খাতের জালিয়াতি সহজ করে ছোট পরিসরে বেশ ভালোই তুলে ধরেছেন ভেঙ্কি। দুলকার সালমানের অভিনয়, ভেঙ্কির সেট ডিজাইন সিনেমাটিকে উপভোগ্য করেছে। দুলকার প্রায় একাই সিনেমাটি টেনে নিয়ে গেছেন, কিন্তু স্বল্প সময়ের জন্য হলেও তাকে সাপোর্ট দিয়েছেন তিনু আনন্দ, সাই কুমার ও শচীন খেদেকার। ভাস্কর ও সুমতির রসায়নের ক্ষেত্রে দুলকার ও মীনাক্ষি চৌধুরীকেও ভালো মানিয়েছে।
মূলত ভাস্করের গল্পটা দর্শকের ভালো লাগার মতো। কেননা মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবন থেকে একজন সাধারণ ব্যক্তি কেমন করে নিজের ও পরিবারের জন্য অসাধারণ হয়ে ওঠে, সে গল্প বলে লাকি ভাস্কর। মানুষকে বিনোদিত করা বা স্বপ্ন দেখানোর এ স্ক্যাম চলছে অনেক দিন। সেখানেও নতুন সংযোজন লাকি ভাস্কর।










