বাংলা লোকনাট্যের একটি জনপ্রিয় ধারা যাত্রাপালা। বহু বছরে ধরে গ্রামীণ বিভিন্ন উৎসব বা মেলায় যাত্রার আয়োজন হয়ে আসছে। যাত্রায় বিনোদন, ধর্মীয় ও সমাজে শিক্ষণীয় বার্তা তুলে ধরা হয়। যাত্রাপালা লোকসাহিত্যের একটি ক্রমবিবর্তিত রূপ। এতে প্রথমে শিবোৎসব, পরে কৃষ্ণোৎসব, তৎপর রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ইত্যাদির প্রচলন হয়। এভাবেই বাংলাদেশে যাত্রার বিকাশ ঘটে। এটি উনিশ শতকে সাধারণ মানুষের বিনোদনের খোরাক জোগাতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। সম্প্রতি গোপালগঞ্জ থেকে উদ্ধার হলো একটি যাত্রাপালার শতবর্ষী পাণ্ডুলিপি।

শত বছর আগে ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (১৯২৫ খ্রি.) গোপালগঞ্জের রঘুনাথপুর গ্রামে ‘বীণাপাণি যাত্রা পার্টি’ নামে একটি যাত্রাদল আত্মপ্রকাশ করে। ১০০ বছর পুরনো ওই যাত্রাদলের একটি পুরনো পাণ্ডুলিপির সন্ধান মিলেছে। পাণ্ডুলিপিটি বাঁশ কাগজ বা ভূর্জপত্রে দোয়াতের কালি ও বাঁশের কঞ্চির কলম দিয়ে লেখা। শতবর্ষ পুরনো এ সাংস্কৃতিক স্মারকটি বীণাপাণি যাত্রাদলের স্বত্বাধিকারী বিধুভূষণ মণ্ডলের পৌত্র, শুকদেব মণ্ডলের পুরনো স্যুটকেস থেকে উদ্ধার হয়েছে। শত বছরের পুরনো ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিক থেকে অত্যন্ত মূল্যবান পাণ্ডুলিপিটি শুকদেব মণ্ডলের পরিবারের পক্ষ থেকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এসব তথ্য জানা যায় বীণাপাণি যাত্রাদলের বর্তমান স্বত্বাধিকারী শুকদেব মণ্ডলের কাছ থেকে। তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের অনেক দলিল দস্তাবেজ হারিয়ে যায়। সম্প্রতি তার মধ্যে কিছু জিনিস খুঁজে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে যাত্রাদলের দাপ্তরিক বা প্রশাসনিক কাগজপত্র ও চুক্তিপত্রের ৪৫টি পৃষ্ঠা রয়েছে। এর সঙ্গে যাত্রাপালার পাণ্ডুলিপিও ছিল। কিন্তু পাতাগুলো ছিঁড়ে অনেক আগেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এ কারণে পালার নাম বা চরিত্র সম্পর্কে জানা যায়নি।

শুকদেব বলেন, ‘আমাদের বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামে। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে আমার বাবার দাদু বিধুভূষণ মণ্ডল যাত্রাদলটি প্রতিষ্ঠা করেন। তখন এ দলে ১০৮ শিল্পী ও কলাকুশলী ছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে যাত্রাদলটি পণমুক্তি, দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণ, কালনাগিনী, বেহুলা লক্ষ্মীন্দর, সতি সাবিত্রী, রাবন বধ, সাধক রাম প্রসাদসহ অনেক জনপ্রিয় যাত্রাপালা মঞ্চস্থ করে। তখন বীণাপাণি যাত্রাদল ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করে।’

শুকদেব আরো জানান, রামায়ণ, মহাভারত, মনসামঙ্গলসহ বিভিন্ন কাব্য, মহাকাব্য থেকে নতুন-নতুন পৌরাণিক যাত্রাপালার পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হতো। যাত্রাদলে একাধিক সদস্য পাণ্ডুলিপির কাজ করতেন। এগুলো বাঁশ কাগজে বা ভূর্জপত্রে কঞ্চির কলম দিয়ে লেখা হতো। বীণাপাণি দলের ১৮টি পাণ্ডুলিপি ছিল। ব্রিটিশ-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দলটির কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। এক পর্যায়ে দলটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

পুনর্গঠিত যাত্রাদলটির তত্ত্বাবধায়ক সুকান্ত মণ্ডল বলেন, ‘শতবর্ষের ঐতিহ্য লালন করতে আমরা এ পাণ্ডুলিপিকে সংরক্ষণ করছি। পাশাপাশি যাত্রদলকে উজ্জীবিত করতে কাজ করে যাচ্ছি।’

গোপালগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমির জেলা কালচারাল অফিসার ফারহান কবীর সিফাত বলেন, ‘যাত্রাপালার পাণ্ডুলিপিটি আমি দেখেছি। সেখানে কিছু পৃষ্ঠা ছেঁড়া। পাণ্ডুলিপিটি বাংলার শতবর্ষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ধারক ও বাহক। এটি বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অনন্য স্মারক।’