অভাবের সংসারে একটু স্বস্তি ফেরাতে আর পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করতে প্রায় ৮ বছর আগে প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কীর্ত্তনখোলা গ্রামের মোশাররফ। কিন্ত সেই সেই স্বপ্ন আর পূরণের আগে কফিনবন্দি হয়ে ১২ দিন পর বাড়ি ফিরলেন সে।

শুক্রবার (২০ মার্চ) সকালে বিমানবন্দর থেকে তার মরদেহ গ্রহণ শেষে গ্রামের বাড়িতে আনা হলে মুহূর্তেই নেমে আসে শোকের ছায়া। প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো দেখতে ভিড় করেন স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসী। কান্না আর আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জীবিকার সন্ধানে আট বছর আগে সৌদি আরব যান মোশাররফ। সৌদি আরবের আল খারিজ শহরের পাশে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে নিরলস পরিশ্রম করতেন। সর্বশেষ দুই বছর আগে তিনি দেশে এসেছিলেন। মৃত্যুর প্রায় আধা ঘণ্টা আগেও বড় ছেলে মাহিমের (১৪) সঙ্গে তার ভিডিও কলে কথা হয়। মোশাররফের বড় ছেলে মাহিম স্থানীয় একটি উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং ছোট ছেলে মিহান (৭) প্রথম শ্রেণির মাদরাসার ছাত্র।

এদিক, মোশাররফকে দেখতে সকাল থেকে উপজেলার কীর্তনখোলা গ্রামে মোশাররফের বাড়িতে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড় দেখা যায়। সবাই তার মরদেহের অপেক্ষায় রয়েছেন। ইতোমধ্যে জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। পারিবারিক কবরস্থানে কবর খোঁড়া হয়েছে এবং স্থানীয় মসজিদ থেকে খাটিয়াও আনা হয়েছে। বিকেল ৫টায় তার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।

বাবা মো. সূর্যত আলী ও মা জহুরা বেগম শোকে বাকরুদ্ধ। মায়ের আহাজারি থামছেই না। বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি। স্ত্রী কবরী আক্তার যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না- যার সঙ্গে কিছুদিন আগেও স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, সেই মানুষটি আজ নিথর হয়ে শুয়ে আছেন তার সামনে।

স্ত্রী কবরী আক্তার বলেন, ঘটনার আগের রাতেও স্বামীর সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘ঈদের আগে টাকা পাঠাবো, ছেলেদের জন্য কিছু কিনো।’ সেই আশ্বাসই এখন পরিণত হয়েছে অসহ্য স্মৃতিতে— যা মনে পড়লেই ভেঙে পড়ছেন তিনি। দুই শিশু সন্তান মাহিম (১৪) ও মিহান (৭) এখনো পুরো বাস্তবতা বুঝে উঠতে পারেনি। ছোট্ট মিহান কখনো বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, কখনো আশপাশের কান্না দেখে বিস্মিত হয়। হয়তো সে এখনো বিশ্বাস করছে, বাবা একটু পরেই উঠে দাঁড়াবেন।

উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকার হজরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি বিশেষ ফ্লাইটে মরদেহ আসে। সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে দুপুর ২টার দিকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। আসরের নামাজের পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।