চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিকভাবে খারাপ সময় পার করছেন লেবাননে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীরা। সেখানে থাকা প্রায় দেড় লাখ প্রবাসীর মধ্যে অন্তত ৪০ হাজার আছেন যাদের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। এ অবস্থায় স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে ইচ্ছুকদের জন্য রেজিস্ট্রেশনের উদ্যোগ নিয়েছে বৈরুতে বাংলাদেশ দূতাবাস। তবে এজন্য উড়োজাহাজ ভাড়াসহ অন্যান্য ফি বাবদ একেকজনকে জমা দিতে হবে প্রায় ৪২ হাজার টাকা, যা জোগাড় করা অনেকটাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে বৈধ ও অবৈধ প্রায় সব প্রবাসীর জন্যই।
২০ ডিসেম্বর এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বৈরুতে বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, লেবাননে বসবাসকারী বৈধ কাগজপত্রবিহীন প্রবাসী বাংলাদেশী কর্মীদের স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য নাম নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দূতাবাস। আগ্রহীদের ২৫ থেকে ২৮ ডিসেম্বরের মধ্যে নিবন্ধন করতে হবে। তবে এজন্য ফি অথবা জরিমানা বাবদ ১ লাখ ৪০ হাজার লেবানিজ লিরা এবং উড়োজাহাজের টিকিট বাবদ ৪০০ মার্কিন ডলার জমা করতে হবে। সব মিলিয়ে এ অর্থের পরিমাণ একজন পূর্ণবয়স্কের জন্য প্রায় ৪২ হাজার টাকা। তবে যেসব প্রবাসীর নামে ফৌজদারি বা অন্য কোনো জটিল মামলা কিংবা কোর্টের গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে, তারা কেবল কোর্টের ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর দেশে ফিরে যেতে পারবেন।
দূতাবাসের তথ্য বলছে, লেবাননে বর্তমানে দেড় লাখের বেশি বাংলাদেশী রয়েছেন। এসব বাংলাদেশীর সিংহভাগই নারী কর্মী, যারা দেশটির বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। যদিও অবৈধ বাংলাদেশীর সঠিক সংখ্যার কোনো হিসাব নেই দূতাবাসে। তবে লেবাননে সক্রিয় প্রবাসী সংগঠনগুলো জানিয়েছে, কাগজপত্রহীন ৪০ হাজারের মতো বাংলাদেশী দেশটিতে বসবাস করছেন। মূলত দেশে ফেরার তাড়া তাদের মধ্যেই বেশি।
গত বছরের শেষের দিক থেকেই মূলত লেবাননে অর্থসংকট চলছে। বর্তমানে দেশটিতে অবস্থান করা প্রবাসী বাংলাদেশীদের অর্ধেকেরই কোনো কাজ নেই। যাদের কাজ আছে, তাদেরও বেতন কমে গেছে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। পাশাপাশি বেড়ে গেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যও। ফলে সেখানে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীদের একটি বড় অংশ খাদ্য সংকটে ভুগছেন। এসব কারণেই বৈধভাবে অবস্থান করা কর্মীরাও দেশে ফিরতে চান।
তবে দূতাবাসের বেঁধে দেয়া খরচ অনেক বেশি বলে অভিযোগ করছেন লেবাননে থাকা প্রবাসীরা। তাদেরই একজন রুদ্র নীল গতকাল বণিক বার্তাকে জানান, উড়োজাহাজ ভাড়া বাবদ ৪০০ ডলার জমা দিতে বলেছে দূতাবাস। কিন্তু ওয়ানওয়ে ভাড়া এত বেশি নয়। দূতাবাসের উচিত এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ভাড়া কমানোর ব্যবস্থা করা। এক বছর ধরে অনেকেরই সঞ্চয় করার মতো আয় নেই। এ অবস্থায় এত টাকা জোগাড় করা বেশির ভাগ প্রবাসীর জন্যই কষ্টকর।
বৈরুতে বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ৭ হাজার ৭৪৫ জন বাংলাদেশী নাম নিবন্ধন করেন। এ নিবন্ধন প্রক্রিয়ার আওতায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রথম ধাপে ৪৫০ বাংলাদেশী দেশে ফেরেন। কিন্তু চলতি বছরের শুরুতে বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের কারণে বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এ কার্যক্রম স্থগিত হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ বিরতির পর গত ২ আগস্ট কাগজপত্রবিহীন প্রবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করা হয়। প্রথম পর্যায়ে ২ আগস্ট দেশটির ডিটেনশন সেন্টারে আটকে থাকা ৬৪ জন বাংলাদেশী কাতার এয়ারওয়েজে করে দেশে ফেরেন। এরপর ৪ আগস্ট আরো একটি ফ্লাইটের মাধ্যমে ৬২ বাংলাদেশী দেশে ফেরেন।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য বলছে, আউট পাস ছাড়াও বৈধভাবে থাকা প্রবাসীরা লেবানন থেকে দেশে ফিরছেন। গত ১ এপ্রিল থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত লেবানন থেকে ফিরে এসেছেন মোট ৭ হাজার ৭৩৪ জন প্রবাসী বাংলাদেশী। এর মধ্যে ৫ হাজার ৬১ জন পুরুষ এবং ২ হাজার ৬৭৩ জন নারী কর্মী। ফিরে আসা কর্মীদের মধ্যে আউট পাস নিয়ে ফিরেছেন মোট ৪ হাজার ৭৬ জন।
জনশক্তি রফতানি ও কর্মসংস্থান উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, লেবাননে ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১ লাখ ৬৭ হাজার বাংলাদেশী কর্মী গিয়েছেন। তাদের মধ্যে নারী কর্মী গেছেন ১ লাখ ৭ হাজার। দেশটিতে ২০১৭ সালে ৮ হাজার ৩২৭ জন, ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৯৯১ ও ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৮৬৩ জন বাংলাদেশী গিয়েছেন।










