রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের ছয় বছর পর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আবার চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে খুলনার প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল ও স্টার জুট মিল। গত ১১ আগস্ট প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল হ্যামকো গ্রুপকে এবং স্টার জুট মিল প্রাণ-আরএফএল গ্রুপকে ইজারা দেয় সরকার। কারখানাসংশ্লিষ্টরা জানান, প্রচলিত পাটজাত পণ্যের পাশাপাশি আধুনিক ও বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটির। এতে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে।

বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৪ সালে খুলনা নগরের খালিশপুরে ভৈরব নদের তীরে ৫০ একর জমিতে প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ভৈরব নদের অন্য পাড়ে দিঘলিয়া উপজেলায় ৫৬ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় স্টার জুট মিল।

প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে প্রায় ২১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে হ্যামকো গ্রুপ। সেখানে উন্নতমানের লিথিয়াম ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যানবাহনসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে কমপক্ষে ১ হাজার ১৫৩ জনের কর্মসংস্থান হবে। সম্ভাব্য বার্ষিক টার্নওভার ধরা হয়েছে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা।

অন্যদিকে স্টার জুট মিলে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। সেখানে ব্যাগ, জুতা, মশারি, ছাতাসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। কারখানাটিতে ৫ হাজার ২৩৮ জনের কর্মসংস্থান এবং প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বার্ষিক টার্নওভারের সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে নতুন করে পাটকল ইজারা দেয়ার এ উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পাটকল শ্রমিক ও নাগরিক নেতারা। তাদের অভিযোগ, আগের ইজারায় দেয়া কয়েকটি কারখানায় বড় পরিসরে পাটপণ্য উৎপাদন হয়নি। কোথাও অন্য শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, আবার কোনো কোনো কারখানা উৎপাদন সংকটে পড়েছে। ফলে ইজারার মাধ্যমে পাটশিল্প ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থান কতটা পুনরুদ্ধার হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে তাদের।

পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদ খুলনার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, ‘‌অতীতে রাষ্ট্রায়ত্ত থেকে বেসরকারি খাতে দেয়া কয়েকটি পাটকল প্রত্যাশা অনুযায়ী চলেনি। তার অভিযোগ, পাটকলগুলো শ্রমিকের কারণে লোকসানে পড়েনি; ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ও অনিয়মের কারণে লোকসান হয়েছে।’ তাই সরকারি উদ্যোগে পাটকলগুলো পুনরায় চালুর দাবি জানান তিনি।

২০২০ সালের জুলাইয়ে লোকসান ও অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয়ের কারণ দেখিয়ে খুলনা অঞ্চলের নয়টিসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে ৪০ হাজারের বেশি স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক কর্মসংস্থান হারান। কয়েক বছর পর পাটকল চালুর উদ্যোগ নেয়া হলেও তা এখনো আংশিক ও অসমভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

বিজেএমসি সূত্রে জানা যায়, খুলনার নয়টি পাটকলের মোট জমির পরিমাণ ৫১৬ একর। এর আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দৌলতপুর জুট মিল ফরচুন গ্রুপকে ইজারা দেয়া হয়। তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনি ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার টেকনোলজি সেখানে ২০২৪ সালের মার্চে জুতা উৎপাদন শুরু করলেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে কারখানাটি লে-অফ রয়েছে। এতে প্রায় ৪৫০ শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন।

২০২৫ সালের এপ্রিলে খালিশপুর জুট মিল রেডিয়েন্ট গ্রুপকে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে স্বল্প পরিসরে পাটের বস্তা ও সুতা উৎপাদন চলছে। একই বছরের জুনে ক্রিসেন্ট জুট মিল ইজারা নেয় মাহবুব গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। সেখানে আটা, ময়দা, সুজি, সয়াবিন তেল ও মুরগির খাদ্য উৎপাদনের প্রস্তুতি চলছে। অন্যদিকে ইজারা-সংক্রান্ত আইনি জটিলতায় আলীম জুট মিলের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

ইজারা দেয়া কারখানাগুলোর মধ্যে জেজেআই জুট মিল তুলনামূলক ভালো চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ২০২৩ সালের মে মাসে আকিজ গ্রুপ কারখানাটির ইজারা নেয়। সেখানে পাটপণ্য উৎপাদন আধুনিকায়নে বিনিয়োগের পাশাপাশি দুই হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন। কার্পেটিং জুট মিল ও ইস্টার্ন জুট মিলও স্বল্প পরিসরে পাটপণ্য উৎপাদন করছে।

বিজেএমসি সূত্র জানায়, বন্ধ পাটকলগুলো চালুর জন্য প্রথমে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) পরিকল্পনা করা হলেও ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি ইজারার দাবি জানান। পরে ৩০ বছরের জন্য পাটকল ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। প্রথমদিকে শুধু পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদনের শর্ত থাকলেও পরে টেক্সটাইলসহ অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের সুযোগ রাখা হয়।