নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে দেশের বেশ কয়েকটি জেলা থেকে নগদ অর্থ উদ্ধারের পর এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে আইনে অবশ্য স্পষ্ট বলা আছে নগদ অর্থ পরিবহনে বাধা নেই, যদি সেটার উৎস বৈধ হয়। নির্বাচন কমিশনও বলছে যেকোনো পরিমাণ অর্থ পরিবহন করা যেতে পারে যদি না সেই অর্থ অবৈধ হয়।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ভেতরে নগদ অর্থ বহনে সীমা না থাকলেও বড় অংকের অর্থ পরিবহনের ক্ষেত্রে অর্থ পাচারবিরোধী আইন ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ আইন প্রযোজ্য হতে পারে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজন মনে করলে নগদের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে।

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ অনুযায়ী ব্যক্তিগতভাবে দেশীয় বা বৈদেশিক মুদ্রা বহনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো সর্বোচ্চ সীমা উল্লেখ নেই, তবে বৈধ আয়ের উৎস (যেমন ব্যাংক উত্তোলন বা ব্যবসার প্রমাণ) না থাকলে তা সন্দেহজনক হিসেবে গণ্য হবে। আইনত অবৈধ বা কর ফাঁকি দেয়া অর্থ পরিবহন নিষিদ্ধ এবং তা বাজেয়াপ্তযোগ্য।

অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, অর্থ পরিবহনের ক্ষেত্রে কোনো সীমা নেই। তবে এ বৈধতা নিশ্চিত করার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যিনি এ অর্থ পরিবহন করছেন তার কাছে যৌক্তিক দালিলিক প্রমাণ রয়েছে কিনা সেটা বিবেচ্য বিষয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচনে আমাদের এখানে টাকার খেলা বা টাকার ব্যবহারের সুযোগ থাকায় এ ধরনের নগদ অর্থ পরিবহনের বিষয়ে অবশ্যই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী এ সময়ে ব্যাংকে বড় ধরনের লেনদেন করা যাবে না। মোবাইল ফোনভিত্তিক আর্থিক সেবা ব্যবহার করে লেনদেন করার সুযোগটাও নিয়ন্ত্রিত। এমন প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি পর্যায়ে বড় অংকের নগদ অর্থ পরিবহনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে অবশ্যই সেক্ষেত্রে এ অর্থের বৈধতা থাকতে হবে। না থাকলে এ অর্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এর মধ্যে যদি দেখা যায় কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নেতার কাছ থেকে এমন অর্থ পাওয়া যায়, তাহলে তো অবশ্যই এ অর্থের ব্যবহার নিয়ে আরো বেশি প্রশ্ন উঠবে। যদি তিনি এর যথাযথ কারণ না ব্যাখ্যা দিতে পারেন, তবে এ জায়গাগুলোতে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এ সময়ে নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া দরকার। কারণ আমরা আমাদের রাজনীতিকে কালো টাকা বা পেশিশক্তি থেকে মুক্ত করতে চাচ্ছি। এর মধ্যে এভাবে নগদ অর্থ বহনের বিষয়টা এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে। এক্ষেত্রে অবশ্যই দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি দলের পক্ষ থেকে এর জবাব চাইতে হবে। যথাযথ জবাব না পেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।’

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নগদ অর্থ উদ্ধারের ঘটনায় বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারলে স্থানীয় পুলিশ এ বিষয়ে মামলা করবে। পরে এ মামলা অনুসন্ধান করে অর্থের বৈধ উৎস খুঁজে না পেলে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে নতুন করে মামলা হতে পারে।

নগদ ৭৪ লাখ টাকা উদ্ধারের পর সৈয়দপুর থানার ওসি রেজাউল করীম বলেন, ‘বেলাল উদ্দিন গার্মেন্টস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং ব্যবসায়িক কাজেই টাকা নিয়ে যাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছেন। তার এ বক্তব্য যাচাই-বাছাই করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ অর্থের উৎস ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি বলেছেন, এ টাকাটি তার ব্যবসার কাজের। এখন পর্যন্ত তিনি এ অর্থের উৎসের কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।

দেশের অভ্যন্তরে নগদ অর্থ বহনে নির্দিষ্ট সীমা নেই: বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশের অভ্যন্তরে ব্যক্তি পর্যায়ে নগদ অর্থ বহনে কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই বলে স্পষ্ট করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। তবে দেশের বাইরে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশী মুদ্রা টাকা বহনের সর্বোচ্চ সীমা ১০ হাজার পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে বলে জানান তিনি। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ব্যাখ্যায় মুখপাত্র বলেন, ‘দেশের ভেতরে একজন ব্যক্তি তার প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো পরিমাণ নগদ অর্থ সঙ্গে রাখতে পারেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো সীমা আরোপ করেনি। তবে দেশের বাইরে যাওয়ার সময় বাংলাদেশী মুদ্রা বহনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা নেয়া যাবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, বিদেশ ভ্রমণের সময় বাংলাদেশী টাকার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা বহনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। অনুমোদিত বা অথরাইজড ডিলার (এডি) ব্যাংকের মাধ্যমে পাসপোর্টে এনডোর্স করে নির্ধারিত হিসাবে বছরে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা নেয়া যায়, যা প্রযোজ্য ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবসায়িক, চিকিৎসা, শিক্ষা বা ব্যক্তিগত ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ভিন্ন সীমা প্রযোজ্য হতে পারে।

অর্থ পরিবহনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কী বলছে

কোনো ব্যক্তি কত টাকা বহন করতে পারবেন, এর আইনি ব্যাখ্যা কী—জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এখানে আইনি ব্যাখ্যার কোনো ব্যাপার নেই। যে কর্তৃপক্ষ টাকা আটক বা উদ্ধার করবে, সেটির ব্যাখ্যা তারা দেবে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কিছু করার নেই।’