হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. সাইদ ইব্রাহিম রাইসি মারা গেছেন। একই পরিণতি হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেন আমির আবদুল্লাহিয়ানসহ হেলিকপ্টারের বাকি সাত আরোহীর। রোববার সন্ধ্যায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ভারজাকান অঞ্চলের একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়। বিধ্বস্ত হওয়ার কারণ তাৎক্ষণিক জানা যায়নি। তবে ঘটনার সময় ভারজাকান অঞ্চলে ঘন কুয়াশা ছিল। খবর বিবিসি, এপি ও আইআরএনএ।
এদিকে রাইসির মৃত্যুর কারণে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবারকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আলি বাগেরি কানি। আটজনের মৃত্যুর ঘটনায় ইরানে পাঁচদিনের শোক ঘোষণা করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম আইআরএনএ জানায়, রোববার সকালে একটি জলাধার প্রকল্প উদ্বোধন করতে পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশে যান রাইসি। উদ্বোধন শেষে বিকালের দিকে সেখান থেকে তিনটি হেলিকপ্টারের বহর নিয়ে পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের রাজধানী তাবরিজে ফিরছিলেন ইব্রাহিম রাইসি ও তার সফরসঙ্গীরা। এর মধ্যে রাইসিকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি ভারজাকান অঞ্চলের একটি পাহাড়ি এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। এরপর উদ্ধারকর্মী, অনুসন্ধানী কুকুর এবং ড্রোন দিয়ে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। কিন্তু ঘন কুয়াশা এবং এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয় উদ্ধারকর্মীদের।
বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারটির সন্ধান পাওয়া যায় গতকাল সকালে। উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয়া তুরস্কের একটি ড্রোন হেলিকপ্টারটি শনাক্ত করে। ঘটনাস্থলে পৌঁছার পর ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (আইআরসিএস) প্রধান হোসেইন কোলিভান্দ জানান, হেলিকপ্টারটির কোনো আরোহী জীবিত নেই। হেলিকপ্টারটি একেবারে পুড়ে গেছে।
হেলিকপ্টারটিতে আরোহী ছিলেন আটজন। এদের মধ্যে চালক ও দুই ক্রু ছিলেন। প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাইরে বাকি তিনজন হলেন পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের গভর্নর মালেক রহমতি, রাইসির দেহরক্ষী টিমের প্রধান মেহদি মৌসাভি ও পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার মুখপাত্র মোহাম্মদ আলি আল-ই-হাসেম।
ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদে ১৯৬০ সালের ১৪ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন রাইসি। ২০২১ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে প্রায় ৪০ বছর দেশটির বিচার বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। রাইসি ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ। ৬৩ বছর বয়সী রাইসিকে অনেকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরি ভাবতেন।
রাইসি প্রথমবার প্রেসিডেন্ট পদে লড়াই করেন ২০১৭ সালের নির্রাচনে। কিন্তু ওই নির্বাচনে তিনি হাসান রুহানির কাছে পরাজিত হন। এরপর ২০২১ সালের নির্বাচনে ৬২ শতাংশ ভোট পেয়ে ইরানের অষ্টম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন রাইসি।
হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেন আমির আবদুল্লাহিয়ানও ইরানের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। বহির্বিশ্বে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চুক্তি সইয়ের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি।
প্রেসিডেন্ট রাইসি যে হেলিকপ্টারে ফিরছিলেন সেটি ‘বেল ২১২’ মডেলের। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা ‘ইউএইচ-১এন’ হেলিকপ্টারের বেসামরিক সংস্করণ এটি। মার্কিন কোম্পানি ‘বেল টেক্সট্রন’-এর তৈরি হেলিকপ্টারটি ২০০০ সালে কিনেছিল ইরান।
ইব্রাহিম রাইসি নিহত হওয়ার ঘটনায় শোক জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা। এ তালিকায় রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
এক শোকবার্তায় পুতিন বলেন, ‘রাইসি একজন অসাধারণ রাজনীতিক ছিলেন, যার পুরো জীবন কেটেছে মাতৃভূমির সেবায়। রাশিয়ার একজন প্রকৃত বন্ধু হিসেবে তিনি আমাদের দেশগুলোর মধ্যে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক গড়ে তুলতে অসামান্য অবদান রেখেছেন।’
এরদোগান বলেন, ‘আমি রাইসিকে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি, যিনি ক্ষমতায় থাকাকালে ইরানের জনগণ ও আমাদের অঞ্চলে শান্তির জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।’
নরেন্দ্র মোদি তার শোকবার্তায় বলেন, ‘ইব্রাহিম রাইসির শোচনীয় মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে দুঃখিত ও মর্মাহত। ভারত-ইরানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তার অবদান সবসময় স্মরণ করা হবে।’
এদিকে রাইসির মৃত্যুর ঘটনায় ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করা এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনায় জড়িত নই।’










