আপনার সেনাবাহিনীতে যুক্ত হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার বিষয়ে জানতে চাই।

১৯৬৯ সালে আমি পাকিস্তানে যাই। পাকিস্তানে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। ন্যাশনাল কলেজ ও ইসলামিয়া ল কলেজে লেখাপড়া করেছি। লর ফাইনাল ইয়ারে থাকা অবস্থায় পাকিস্তান আর্মিতে কমিশনপ্রাপ্ত হই। কমিশনপ্রাপ্ত হওয়ার পর প্রথমেই বদলি হই জয়দেবপুরে। এরপর আবার লাহোর চলে যাই। লাহোর থেকে কুমিল্লায় ফিরে আসি। সে সময় থেকেই দেখি বাংলাদেশের প্রতি একটা অন্যায় করা হচ্ছে। অর্থনীতির পাশাপাশি সমাজের নানা ক্ষেত্রে অন্যায় করা হচ্ছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সশস্ত্র বাহিনীতে আমরা ছিলাম সংখ্যালঘু। যদিও আমাদের জনসংখ্যা তাদের চেয়ে বেশি ছিল। সেই অনুপাতে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীতে আমাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল না; ৭ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সিভিল সার্ভিস বা আধা সামরিক বাহিনীতেও যেসব প্রতিষ্ঠান ছিল, সেগুলোতেও প্রতিনিধিত্ব ছিল কম। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না। এখানে যে বাজেট আসত তা নিয়ন্ত্রণ করতেন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বড় বড় কর্মকর্তা। বাজেটের অর্থ খরচ না করে বছর শেষে তারা পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত পাঠিয়ে দিতেন। তখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের প্রতি একটা বৈষম্য ছিল। সব দূতাবাস পশ্চিম পাকিস্তানে হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের লোকজন বিদেশ যাওয়া থেকে বঞ্চিত হতো। সে সময় আমি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বদলি হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের কুমিল্লায় চলে আসি। সেখান থেকে বদলি হয়ে আসি অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্ট চট্টগ্রামে। ওই সময় সত্তরের নির্বাচন চলছিল। নির্বাচনে ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়াটা আমাদের চিন্তাভাবনায় বড় রকমের প্রভাব ফেলে। 

সত্তরের নির্বাচনের পর আপনাদের মধ্যে কী ধরনের আলোচনা চলছিল? 

জানুয়ারির (১৯৭১) শুরু কিংবা শেষের দিকের ঘটনা। চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টে ছিলেন এমআর চৌধুরী। তখন তিনিও বদলি হয়ে চট্টগ্রামে এলেন। তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারের প্রথম চিফ ইনস্ট্রাক্টর ছিলেন। তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল ছেলে-বাবার মতো ঘনিষ্ঠ। তিনি একদিন তার বাসায় আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, ‘‌অলি, বঙ্গবন্ধুর হাতে পাকিস্তান ক্ষমতা হস্তান্তর করবে বলে কি তুমি মনে করো?’ আমি বললাম, ‌কোনো অবস্থায়ই বঙ্গবন্ধুকে তারা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেবে না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদের করণীয় কী?’ আমি বললাম, ‌বিদ্রোহ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হবে। আমরা দুজন একমত হলাম। 

এরপর অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টে যাওয়ার পর আমার পরিচয় ঘটে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। ওনার আর আমার অফিস পাশাপাশি ছিল। তিনি আমাকে ওনার বাসায় একদিন ডেকে পাঠালেন।

ওই সময় পশ্চিম পাকিস্তানের পরিস্থিতি কেমন ছিল?

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নতুন নতুন সেনাদল আমাদের এখানে আসা শুরু করেছে। সঙ্গে ছিল গোলাবারুদ। এগুলো চট্টগ্রাম দিয়ে আসত। আর আমি যেহেতু চট্টগ্রামের ছেলে, তাই এসব সংবাদ দ্রুতই পেতাম।

প্রায় মানুষই যে স্বাধীনতার পক্ষে, এটা কখন বুঝতে পারলেন?

মার্চের ১ বা ২ তারিখে চট্টগ্রামে ঘরে ঘরে দেখলাম বাংলাদেশের পতাকা টাঙানো। তখন বুঝলাম জনগণ স্বাধীনতার পক্ষে। এরপর আমি কর্নেল এমআর চৌধুরীকে জিয়াউর রহমান সাহেবের কথা বললাম। আর জিয়াউর রহমানকেও কর্নেল এমআর চৌধুরীর কথা বললাম। তখন আমরা তিনজন মিলে বিদ্রোহ করব বলে ঠিক করলাম। অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কে কী করবে, সেসব ঠিক করলাম। 

সে সময় চট্টগ্রামে ছিল টোয়েন্টি বেলুচ রেজিমেন্ট। আমাদের সঙ্গে কথা হলো, এমআর চৌধুরী টোয়েন্টি বেলুচ রেজিমেন্টকে আটকাবেন। আর যেদিকে প্রয়োজন পড়ে সেদিকে যাবেন। 

এরপর খবর পেলাম, ইয়াহিয়া একটি দলবল নিয়ে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে আসছে। সঙ্গে ভুট্টোও আছেন। আমরা তখন বুঝলাম পাকিস্তানিরা অস্ত্র আর গোলাবারুদ নিয়ে আসার জন্য সময়ক্ষেপণ করছে। আমাদের এখানে কেউ চিন্তাও করেনি যে পাকিস্তানিরা তাদের সেনাবাহিনী নিয়ে আসছে আমাদের দমন করার জন্য। আমরা চট্টগ্রামে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত ছিলাম। 

২৩ কিংবা ২৪ মার্চের দিকে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ চট্টগ্রাম এলেন। জিয়াউর রহমান আর আমার সঙ্গে দেখা করলেন। তখন তিনি চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তা। তাকে বললাম, আমরা বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। আপনিও চতুর্থ বেঙ্গলে গিয়ে বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত হন। 

২৫ মার্চ সকালে আমি প্যারেড গ্রাউন্ডে গিয়ে দেখি ওখানে কেউ নেই। তখন জানতে পারি, ষোলশহর রেল ক্রসিংয়ে একটি রেলগাড়ি গতকাল রাতে কেউ আটকে রেখে গেছে। চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সঙ্গে সড়কপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। সেটি আর সরানো হয়নি। সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি তখন মেসে ফিরে আসি। আমার কাছে অফিসের ফান্ড ছিল ৫ বা ৬ হাজার টাকা। আর ছিল একটি পিস্তল। এরপর অফিসে গিয়ে নিজে নিজেই ডিউটি অফিসারের দায়িত্ব নিয়ে নিলাম। অন্যদিকে আব্দুল রশিদ জানজুয়া তখন অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত করে বিভিন্ন জেলায় পাঠিয়ে দিলেন। 

ওইদিন বিকালে লেফটেন্যান্ট আজম এসে হাজির। বললেন, ‘স্যার আমি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিউটি অফিসার। পাকিস্তান আর্মিতে এমন পদবি ছিল না। তাকে আমার ওপর নজরদারি করার জন্যই পাঠানো হয়েছিল। তখন সবাইকে সতর্ক থাকার জন্য বললাম। ওইদিন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেখা করে বললাম, আজ রাতেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আক্রমণ করবে। 

আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে শুনে আপনারা কী পদক্ষেপ নিলেন?

এরই মধ্যে সুবেদার মেজর আব্দুল হামিদকে দিয়ে অস্ত্রাগারের তালা ভেঙে বাঙালি সেনাদের অস্ত্র দিয়ে ছাদের ওপর দাঁড় করিয়ে দিলাম। দুজনকে বন্দি করলাম। কিছুক্ষণ পর আরো কয়েকজনকে বন্দি করলাম। অর্থাৎ পাঞ্জাবি সব অফিসারকে আটক করলাম। বাকি ছিল শুধু জানজুয়া সাহেব। তখন জিয়াউর রহমান এসে বললেন, ‘আমরা বিদ্রোহ করলাম। এ মুহূর্ত থেকে। তোমাদের ১১ জনকে গ্রেফতার করা হলো।’ এরপর তাদেরও গ্রেফতার করে নিয়ে এলাম। 

কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকিস্তানের অফিসার ও দু-একজন সেনাসদস্য নিহত হলেন। সিডিএ মার্কেটের মধ্যে একটি খোলা জায়গা ছিল, সেখানে অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সব সদস্যকে একত্র করে জিয়াউর রহমানের কাছে হস্তান্তর করলাম। আমরা তখন ঘোষণা করলাম, বাংলাদেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। আমরা দেখলাম, অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্ট এখানে থাকলে আক্রমণ হবে। তখন আমরা বোয়ালখালী করলডেঙ্গা পাহাড়ে গেলাম। সেখানে জিয়াউর রহমান সাহেব সবাইকে ওজু করে আসতে বললেন। এর পরই তিনি সবাইকে শপথ বাক্য পাঠ করান যে বাংলাদেশের প্রতি আমাদের সম্পূর্ণ আনুগত্য থাকবে। জীবন থাকা পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করে যাব। 

অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টকে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করা হলো। মীর শওকত আলী সাহেবকে দায়িত্ব দেয়া হলো, তিনি একটি গ্রুপ নিয়ে চট্টগ্রামে যাবেন। ক্যাপ্টেম সাদিককে একটি গ্রুপ নিয়ে সীতাকুণ্ডে, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানকে চকবাজার ও লেফটেন্যান্ট শমসের মবিনকে মেডিকেল এলাকায় থাকার দায়িত্ব দেয়া হলো।