অনুমোদনের সাড়ে তিন বছর পর চট্টগ্রাম ওয়াসার ভান্ডালজুড়ি পানি পরিশোধন প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের শেষ নাগাদ। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ পায় কোরীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাইইয়ং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড। প্রকল্পের কাজে অননুমোদিতভাবে দেশীয় একাধিক প্রতিষ্ঠানকে উপঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে এএনএফএল কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামের বিতর্কিত একটি প্রতিষ্ঠানকে উপঠিকাদার বানানোয় স্থানীয়দের বিক্ষোভের মুখে প্রকল্প এলাকায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ফলে প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে শেষ হওয়া নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

জানা গেছে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের তিন উপজেলায় পানি সরবরাহের জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসার ‘ভান্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্পের’ কাজ শুরু হয়। দেরিতে কাজ শুরু হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে যায়। আগে যেখানে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা, সেখানে বিলম্ব হওয়ায় এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৯৫ কোটি ২৪ লাখ টাকায়। অর্থাৎ বিলম্বের কারণে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে ১৫৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকারও বেশি।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২০১৯ সালের জুনে তাইইয়ং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি হয় চট্টগ্রাম ওয়াসার। ওই বছরের মাঝামাঝিতেই ৫১তম বোর্ডসভায় সংস্থাটির বিভিন্ন প্রকল্পে উপঠিকাদার নিয়োগ দিতে বোর্ডের অনুমোদন লাগবে বলে সিদ্ধান্ত নেয় চট্টগ্রাম ওয়াসা। কিন্তু চট্টগ্রাম ওয়াসার বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে একাধিক উপঠিকাদার নিয়োগ দিয়েছে কোরীয় মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। এমনই এক উপঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এএনএফএল কনস্ট্রাকশন নিয়ে বিতর্ক প্রকল্প এলাকায় বেশ বিশৃঙ্খলার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে ৫ ফেব্রুয়ারি মিলিটারিপুল এলাকায় প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দেয় স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনসাধারণ। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ৮ ফেব্রুয়ারি সীমিত পরিসরে কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। তবে কাজ শুরু হলেও প্রকল্প এলাকার মানুষের বিক্ষোভের আশঙ্কায় ভান্ডালজুড়ি প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে খোদ ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে চট্টগ্রাম ওয়াসার এক বোর্ড সদস্য বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রকল্পগুলোর ঠিকাদার নিয়োগ নিয়ে সমস্যার শেষ নেই। উপঠিকাদার নিয়োগ নিতে ওয়াসা বোর্ডের অনুমোদনের কথা থাকলেও কোরীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেসব সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা করছে না। সম্প্রতি ভান্ডালজুড়ি প্রকল্পে একটি প্রতিষ্ঠানকে উপঠিকাদারের কাজ দেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির জামায়াতঘনিষ্ঠতার অভিযোগ তুলে স্থানীয়রা প্রকল্পের কাজে বাধা দিচ্ছেন। এভাবে বাধাগ্রস্ত হলে প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হবে না। পাশাপাশি সময় বাড়ার কারণে প্রকল্পের ব্যয় আরো বেড়ে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।

কোরীয় সরকারের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অব কো-অপারেশন ফান্ডের (কেইডিসিএফ) পক্ষে কোরীয় এক্সিম ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সরকার ও চট্টগ্রাম ওয়াসার অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি সরবরাহ ক্ষমতা বাড়বে দিনে ৬ কোটি লিটার।

গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের কাজে ব্যাঘাত ঘটার কারণ জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক মুহাম্মদ মাহবুব আলম বণিক বার্তাকে বলেন, প্রকল্প এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় প্রকল্পের কাজ কয়েকদিন বন্ধ ছিল। ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কাজ শুরু হয়েছে। ঠিক কোন কারণে প্রকল্পের কাজে স্থানীয়ভাবে বাধা দেয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আমরা কিছুই জানতে পারিনি। অনুমোদনের পর কাজ শুরু করতে বিলম্ব হওয়ায় আমরা দ্রুত কাজ শেষ করতে চাইছি। 

ভান্ডালজুড়ি প্রকল্পের উপঠিকাদার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত এএনএফএল কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী মো. আহসানুল করীম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের এক সাবেক সভাপতি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক সহযোগী বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এছাড়া সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থাও বর্তমানে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মীর কাশেম আলীর রেখে যাওয়া সম্পদ এএনএফএল প্রপার্টিজসহ একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে বিনিয়োগের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করছে।

জানা গেছে, ১৯৯৬ সালের দিকে লাইব্রেরির ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন আহসানুল করীম। পরে চট্টগ্রামে ব্রোকারের ব্যবসায় নাম লেখান তিনি। কয়েক বছর ধরে হঠাৎ করেই প্রপার্টিজ ব্যবসায় আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। পাশাপাশি সরকারি বড় বড় প্রকল্পের ঠিকাদার, উপঠিকাদার হিসেবে কাজ পেতে শুরু করেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিজের জামায়াতঘনিষ্ঠতার কথা অস্বীকার করেন এএনএফএলের কর্ণধার আহসানুল করীম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বিষয়টি অপপ্রচার ছাড়া আর কিছুই না। মাটি ভরাট নিয়ে স্থানীয় কিছু মানুষের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় কয়েক ঘণ্টা কাজ বন্ধ ছিল। বর্তমানে পুরোপুরি কাজ চলছে। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করতে এ অপপ্রচার চালাচ্ছে।

কাজ বন্ধের কারণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বোয়ালখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নেয়ামত উল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ঠিক কোন কারণে প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়েছে আমাদের জানা নেই। তবে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসি। এর পরদিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসায় প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে।

এদিকে চট্টগ্রাম ওয়াসার ভান্ডালজুড়ি প্রকল্পে ঠিকাদারি কাজ নিয়ে চলমান বিশৃঙ্খলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশও (ক্যাব)। এ নিয়ে সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়, বোয়ালখালীর ভান্ডালজুড়ি প্রকল্পের জন্য কোরিয়ার তাইইয়ুং নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ঠিকাদার নিয়োগ করা হলেও তারা কাজটি সম্পাদন না করে উপঠিকাদার নিয়োগ দিয়েছে। এসব উপঠিকাদার আবার অন্যদের কাজটি সম্পাদনের দায়িত্ব দিচ্ছে। ফলে কোরীয় ঠিকাদার শেষ পর্যন্ত কমিশন এজেন্ট ও কাজ বণ্টনকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থ চলে যাচ্ছে কমিশনের ভাগভাটোয়ারায়। পাশাপাশি কাজের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে প্রতিনিয়ত দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও মারামারি লেগে আছে। এতে এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি হচ্ছে।

এ বিবৃতির স্বাক্ষরকারীরা হলেন ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন, ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী, ক্যাব মহানগরের সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু, সাধারণ সম্পাদক অজয় মিত্র শংকু, যুগ্ম সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম ও ক্যাব চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সভাপতি আবদুল মান্নান।