নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে গত ১৭ মার্চ থেকে চট্টগ্রামের অধিকাংশ হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর সব ধরনের খাবারের দোকান ও রেস্টুরেন্ট বন্ধ রাখা হয়। তবে মার্চের শেষ দিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ সীমিত পরিসরে রেস্টুরেন্ট খোলার অনুমিত দেয়। এতে সাড়া না দিলেও সম্প্রতি শুধু পার্সেল সার্ভিসের মাধ্যমে হোটেল-রেস্টুরেন্ট খোলার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এজন্য প্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইন ফুড সরবরাহ সার্ভিসের পাশাপাশি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় খাবার সরবরাহের উদ্যোগ নিচ্ছে।
চট্টগ্রামের উইন্ড অব চেইঞ্জ রেস্টুরেন্ট প্রায় দেড় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি অনলাইনে খাবার সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়েছে। এরই মধ্যে চারজন ডেলিভারি ম্যান নিয়োগ দিয়ে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা পালন করতে রেস্টুরেন্টে এসে খাওয়ার সুযোগ না থাকলেও ক্রেতারা এসে খাবার ক্রয় করে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে।
চলাচল সীমিত থাকার কারণে পুরোদমে রেস্টুরেন্ট খোলার সুযোগ না থাকায় বিকল্প চিন্তাভাবনা করছেন চট্টগ্রামের অধিকাংশ ব্যবসায়ী। এভাবে দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখা হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা ছাড়াও প্রতি মাসের পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করতে হবে। টানা লোকসানের কারণে ভবিষ্যতে অনেক রেস্টুরেন্ট চালু করা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এর থেকে উত্তরণে অনলাইন সার্ভিস চালুর পরিকল্পা করছেন উদ্যোক্তারা।
এ বিষয়ে উইন্ড অব চেইঞ্জের চেয়ারম্যান সৈয়দ রুম্মান রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রামের কয়েকশ রেস্টুরেন্ট রয়েছে। নভেল করোনাভাইরাসের সংকটে প্রায় সবগুলো প্রতিষ্ঠানই বন্ধ। এ কারণে রেস্টুরেন্ট খাতের উদ্যোক্তারাও কঠিন সময় পার করছেন। কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, স্পেস ভাড়া, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল নিয়মিত পরিশোধের কারণে অনেকে এরই মধ্যে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার অবস্থা। অন্য খাতের উদ্যোক্তারা ব্যাংকঋণ সুবিধা নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করলেও রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ঋণের পরিমাণ ১০ শতাংশের বেশি নয়। ফলে বর্তমান ক্রান্তিকালে ব্যাংকের কাছ থেকে সহযোগিতাও পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর অর্ধেক রেস্টুরেন্টই দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে।
তিনি আরো বলেন, পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এরই মধ্যে অনলাইন ও পার্সেল সার্ভিসের ওপর জোর দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। নতুন এই পরিস্থিতিতে দেশের প্রায় সব ধরনের ক্রেতা সমাগমধর্মী ব্যবসার উদ্যোক্তারা ভোক্তাদের দোরগোড়ায় সেবা দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চট্টগ্রামে প্রশাসনের কাছ থেকেও সীমিত পরিসরে রেস্টুরেন্ট খোলা রাখার অনুমতি মিলেছে। আশা করছি, অনলাইন সার্ভিসের মাধ্যমে হলেও কার্যক্রম সীমিত পরিসরে চালু করে টিকে থাকার চেষ্টা করবেন ব্যবসায়ীরা।
এর আগে গত ২৯ মার্চ মহানগর পুলিশ কমিশনার (সিএমপি) মো. মাহাবুবর রহমান শুধু খাবার সংগ্রহ করে বাসায় পার্সেল নেয়াসাপেক্ষে রেস্টুরেন্ট খুলতে ব্যবসায়ীদের অনুমতি দেন। এজন্য বেশকিছু নির্দেশনাও জারি করেন রেস্টুরেন্ট মালিকদের জন্য। নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে, রেস্টুরেন্টের অভ্যন্তরে খাবার বিতরণ না করা, স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ক্রেতাদের আসা-যাওয়া নিশ্চিত করা, খাবার সংগ্রহের সময় ক্রেতাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে লাইনে দাঁড়ানো, রেস্টুরেন্টের অভ্যন্তরে ভিড় না করা, খাবার তৈরি থেকে বিক্রি পর্যন্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে চলা, রেস্টুরেন্ট বা খাবারের দোকানে প্রবেশপথে হ্যান্ডওয়াশ বা হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রাখা ইত্যাদি। রেস্টুরেন্ট খোলা থাকলে তদারকির জন্য নগরীর ১৬টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য নির্দেশনাও দেয়া হয়।
চট্টগ্রামের সিআরবিস্থ তাসফিয়া রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী নাজিম উদ্দিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, হঠাৎ রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক কাঁচামাল এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ২ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় রেস্টুরেন্ট না খুললে একেবারেই বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। অনেক রেস্টুরেন্ট মালিক সীমিত পরিসরে খোলার পরিকল্পনা করছেন। আমরাও অনলাইন-পার্সেল সার্ভিসের মাধ্যমে রেস্টুরেন্ট খোলার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছি। অন্তত কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পরিচালন ব্যয় নির্বাহের জন্য হলেও সীমিত পরিসরে খোলা রাখা ছাড়া উপায় নেই।
এদিকে চট্টগ্রামের অধিকাংশ রেস্টুরেন্টই এরই মধ্যে অনলাইন সার্ভিসের জন্য প্রচারণা শুরু করেছে। এর মধ্যে রোদেলা বিকেল, সেভেন ডেজ, সাদিয়া’স কিচেন, বারকোড, গ্রেভি ডাইনসহ বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট অনলাইনে ও নিজস্ব সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় চালু করেছে। অনেকেই সীমিত আকারে ইফতারসামগ্রী সরবরাহ শুরু করেছে। যানবাহন চলাচল কম থাকায় দ্রুত সময়ের মধ্যে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় হোম সার্ভিসের মাধ্যমে ক্রেতাদের মধ্যে দ্রুত সেবা দিতে পারছে বলে জানিয়েছেন রেস্টুরেন্ট উদ্যোক্তারা।









