বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনীতি হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠী, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর সুযোগ এ অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এসব সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যাংক খাতের আধুনিকায়ন জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন টেমেনোসের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক উইলিয়াম ডেলি।

তিনি বলেন, ‘‌বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ। দেশটি বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কর্মক্ষম বয়সের, যা জনমিতিক লভ্যাংশ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) কাজে লাগানোর বড় সুযোগ তৈরি করেছে। এ বিপুল জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবার আওতায় আনা গেলে অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হবে। একই সঙ্গে তা দেশের ব্যাংক খাতের জন্যও বড় অর্জন হবে।’

গতকাল রাজধানীর হোটেল শেরাটনে আয়োজিত ‘টেমেনোস কানেক্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে এক প্যানেল আলোচনায় এসব কথা বলেন উইলিয়াম ডেলি। আলোচনা সঞ্চালনা করেন থাকরাল ইনফরমেশন সিস্টেমসের নির্বাহী পরিচালক বাসব পি বাগচী।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের চিত্র তুলে ধরে উইলিয়াম ডেলি বলেন, ‘‌দেশে বর্তমানে প্রায় ১৯ কোটি মোবাইল সংযোগ ও ১৩ কোটি ৬০ লাখ ইন্টারনেট গ্রাহক রয়েছেন। প্রযুক্তির এ বিস্তার ব্যাংকিং সেবার আধুনিকায়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’

বাংলাদেশে টেমেনোসের কার্যক্রম সম্পর্কে উইলিয়াম ডেলি জানান, প্রতিষ্ঠানটি প্রাইম ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, আইডিএলসি ফাইন্যান্স ও আইপিডিসিসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৫০টি ব্যাংক টেমেনোসের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৩৬টি দেশে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

প্যানেল আলোচনায় অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংক খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আজ সামান্য সাশ্রয় করতে গিয়ে ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলোকে বড় ধরনের ব্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে। তাই শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।’

নিজের ব্যাংকিং জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘২০০৪ সালের অক্টোবরে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যাংকটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের মধ্যে ব্যাংকটি টেমেনোসের টি-২৪ কোর ব্যাংকিং সিস্টেম এবং আইবিএমের হার্ডওয়্যার ব্যবহার শুরু করে। অগ্রণী ব্যাংকই বাংলাদেশের প্রথম সরকারি ব্যাংক, যারা বিদেশী কোর ব্যাংকিং সিস্টেম গ্রহণ করেছিল।’

সরকারি ব্যাংকের গ্রাহকদেরও বেসরকারি ব্যাংকের গ্রাহকদের মতো মানসম্মত সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‌সেবার মানের দিক থেকে সরকারি ব্যাংকগুলোর পিছিয়ে থাকার কোনো কারণ নেই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন গ্রাহকও রাজধানীর গ্রাহকের মতো দ্রুত, নির্ভুল ও আন্তরিক ব্যাংকিং সেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন।’

বখতিয়ার আহমেদ আরো বলেন, ‘অগ্রণী ব্যাংক দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে উন্নত প্রযুক্তির বিকল্প নেই। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাস্তবে রূপ পাবে।’

কোনো ব্যাংক এককভাবে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি উন্নয়ন করতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের চাহিদা সম্পর্কে জানে, আর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো জানে কীভাবে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। দুই পক্ষ একসঙ্গে কাজ করলে ব্যাংক খাতের অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে। এ বিষয়ে টেমেনোস কাজ করছে, যা আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম করছে।’ এ সময় বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

বৈশ্বিক যুদ্ধবিগ্রহ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ব্যাংকিং ব্যবস্থা কীভাবে টিকে থাকতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, ‘দেশে মাত্র ছয়-সাতটি ব্যাংক সরাসরি রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে। অন্য ব্যাংকগুলো বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রেমিট্যান্স গ্রহণ করে। সামগ্রিকভাবে জ্যেষ্ঠ ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যাংক খাতের সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব। অতীতেও এভাবে সমস্যার সমাধান হয়েছে।‌ প্রবাসীরা দেশের প্রতি আস্থাশীল এবং সন্তুষ্ট বলেই ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। দেশের জন্য তাদের অবদান অব্যাহত রয়েছে।’

প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনাকালে বাসব পি বাগচী বলেন, ‘ভবিষ্যতের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে প্রযুক্তির সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত আধুনিকায়নের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে কথোপকথনভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের যুগের জন্যও প্রস্তুত হতে হবে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ব্যাংকগুলো এরই মধ্যে আধুনিকায়ন, ক্লাউড প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যাংকিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) বিনিয়োগ করছে। তবে এসব বিনিয়োগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে গ্রাহকসেবার মানোন্নয়ন, পরিচালনাগত দক্ষতা ও ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিতে কতটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে তার ওপর।’

আলোচনায় ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবিন বলেন, ‘ব্যাংক খাতে গ্রাহকের আস্থা অর্জন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনাকে গ্রাহকবান্ধব করতে হবে। ব্যাংক সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে শুধু উন্নত সফটওয়্যার ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।’

তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং কার্যক্রমে ব্যবহৃত সফটওয়্যার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি ব্যাংকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা প্রয়োজন। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও চেয়ারম্যানদেরও তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে যথাযথ দক্ষতা ও ধারণা থাকতে হবে।’

অনুষ্ঠানে ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে প্যানেল আলোচনায় বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে দুর্নীতি অন্যতম বড় বাধা। তবে এ কারণে হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। চীন ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশও একসময় দুর্নীতির সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছে। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষতা ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসব সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব, আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই।’

প্যানেল আলোচনায় বক্তারা দেশের ব্যাংক খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, দক্ষ জনবল, সুশাসন ও গ্রাহকের আস্থা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন। তারা জানান, বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় ব্যাংকগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ দেশের আর্থিক খাতকে আরো গতিশীল করতে পারে।