অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে মত প্রকাশের স্বাধীনতা পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের চেয়ে বেড়েছে বলে মনে করেন ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ এবং এই আমলে সংবাদ মাধ্যমগুলো আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে বলে মত ৬১ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের। এছাড়া বাংলাদেশের ৫৭ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেয়ার পক্ষে এবং, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
ভয়েস অব আমেরিকা (ভিওএ) বাংলার করা এক জরিপে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অক্টোবরের ১৩ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত দেশের ৮ টি বিভাগে ১৮ বছর বা এর চেয়ে বেশি বয়সী ১ হাজার মানুষের মধ্যে জরিপটি করা হয়।
আওয়ামী লীগকে কি নিষিদ্ধ করা উচিত না রাজনীতি করতে দেয়া উচিত— এ প্রশ্নের উত্তরে উত্তরদাতাদের ৪ দশমিক ৯ শতাংশ এ ব্যাপারে জানেন না বলেছেন আর ২ দশমিক ৬ শতাংশ এ প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হননি।
অন্য উত্তরদাতাদের তুলনায় ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণ উত্তরদাতারা (৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ) আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পক্ষে বেশি সংখ্যায় মত দিয়েছেন। অন্যদিকে ৩৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী উত্তরদাতাদের ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পক্ষে।
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করলে কতদিনের জন্য করা উচিত— এমন প্রশ্নের জবাবে যারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা উচিত বলে মত দিয়েছেন সেসব উত্তরদাতাদের অর্ধেকের বেশি, ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, আওয়ামী লীগকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা উচিত।
নিষিদ্ধের পক্ষে মত দেয়া উত্তরদাতাদের ১৫ দশমিক ২ শতাংশ দেখতে চান আওয়ামী লীগকে ১০ বছরের বেশি সময় নিষিদ্ধ করা হয়েছে আর ৫ থেকে ১০ বছর নিষিদ্ধ করা হয়েছে দেখতে চান ৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পক্ষে মত দেয়া উত্তরদাতাদের ১১ দশমিক ২ শতাংশ চান ১ থেকে ৫ বছর নিষিদ্ধ আর ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বলেছেন তারা ১ বছরের জন্য আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে। এ ব্যাপারে উত্তর দিতে চাননি ১ দশমিক ৮ ও জানেন না বলেছেন ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
তরুণ উত্তরদাতাদের (১৮ থেকে ৩৪) ৫৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ৩৫ বা তার চেয়ে বেশি বয়সী ৬০ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা আওয়ামী লীগকে রাজনীতি চালিয়ে যেতে দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। নারী উত্তরদাতাদের মধ্যে ৫২ দশমিক ২ ও পুরুষদের মধ্যে ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা চান আওয়ামী লীগকে রাজনীতি চালিয়ে যেতে দেয়া হোক। আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেয়া উচিত বলে মনে করেন গ্রামীণ উত্তরদাতাদের ৫৭ দশমিক ১ শতাংশ ও শহরের উত্তরদাতাদের ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
এদিকে, আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে থেকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন তরুণ উত্তরদাতাদের (১৮ থেকে ৩৪) ৩৯ দশমিক ৯ এবং ৩৫ বা তার চেয়ে বেশি বয়সী উত্তরদাতাদের ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ। শহরের উত্তরদাতাদের ৩৮ দশমিক ২ এবং গ্রামীণ উত্তরদাতাদের ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ দেখতে চান। নারীদের মধ্যে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ চান ৩৮ দশমিক ৭ ও পুরুষদের মধ্যে ৩২ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা।
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ আমলের মতন একই রকম স্বাধীনতা ভোগ করছেন বলে মত দিয়েছেন ২৫ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা, এবং আওয়ামী আমলের চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম স্বাধীনতা ভোগ করছেন বলে জানিয়েছেন ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। এ ব্যাপারে কথা বলতে চাননি শূন্য দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা।
পুরুষদের মধ্যে ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা ও নারী উত্তরদাতাদের ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আগের সরকারের সময়ের চেয়ে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে নিজেদের বেশি স্বাধীন বলে মত দিয়েছেন।
তরুণদের (১৮ থেকে ৩৪) মধ্যে ৫৭ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা বেশি বলে মনে করেন আর ৩৫ বছর ও এর বেশি বয়সী উত্তরদাতাদের ৬৩ দশমিক ৮ শতাংশ মত দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আগের আমলের চেয়ে বেশি।
গ্রামের উত্তরদাতাদের মধ্যে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং শহরের উত্তরদাতাদের ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগ আমলের তুলনায় মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বেশি স্বাধীনতা পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংবাদমাধ্যমগুলো আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে বলে মত দিয়েছেন জরিপে অংশগ্রহণকারী ৬১ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা ।
সংবাদ মাধ্যমগুলোর স্বাধীনতা ভোগের ক্ষেত্রে এই দুই আমলের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেন না ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে সংবাদ মাধ্যমগুলো কম স্বাধীন বলে মনে করেন ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ৬ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা এ ব্যাপারে জানেন না বলেছেন। এছাড়া, শূন্য দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আওয়ামী আমলের তুলনায় সংবাদমাধ্যমগুলো অপেক্ষাকৃত বেশি স্বাধীনতা পাচ্ছে শহরের উত্তরদাতাদের ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ এমনটি মনে করেন। গ্রামের উত্তরদাতাদের মধ্যে এমন মত পোষণ করেন ৫৭ দশমিক ১ শতাংশ।
তরুণদের (১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী) মধ্যে ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা এবং ৩৫ ও তারচেয়ে বেশি বয়সী উত্তরদাতাদের ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন বর্তমান সরকারের আমলে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় সংবাদমাধ্যমগুলো অপেক্ষাকৃত বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে।
পুরুষদের মধ্যে ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ ও নারীদের মধ্যে ৫৪ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আগের আমলের চেয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে বলে মত দিয়েছে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত সবশেষ মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬৫তম, যা ২০০২ সাল থেকে মুক্ত গণমাধ্যম সূচক প্রকাশ শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বনিম্ন।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর টানা চার মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত ১৫ বছরে মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে ৪৪ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ।
গণমাধ্যম সূচকের এই অবনতির পেছনে যেসব কারণগুলো বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সরকারের বিভিন্ন নিপীড়নমূলক আইন, দলীয় বিবেচনায় গণমাধ্যমের লাইসেন্স প্রদান এবং গণমাধ্যমকে একটি ভীতির মধ্যে রাখা।










