চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায় কাজী ফার্মসের বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন হয় ২০১৯ সালে। সানোয়ারা গ্রুপের কাছ থেকে জমি কেনা সাপেক্ষে উপজেলার দিয়াকুলে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল কাজী ফার্মসের। তবে জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে এ দুই শিল্প গ্রুপের মধ্যে দেখা দিয়েছে দ্বন্দ্ব। এরই মধ্যে বিবদমান এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যক্রম পরিচালনা স্থগিত রাখতে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)।

গত ৯ নভেম্বর জারি করা বেজার এক আদেশ অনুযায়ী, কাজী ফার্মস ইকোনমিক জোনের ঘোষিত তফসিলে ২৯টি দাগে সানোয়ারা গ্রুপের অংশ রয়েছে। দিয়াকুল মৌজার ৩২০ একর জমির মধ্যে কাজী ফার্মসের ক্রয় করা ১১২ দশমিক ১১ একর জমির সীমানা এখন পর্যন্ত নির্ধারণ হয়নি। কাজী ফার্মসের অনুকূলে নামজারি, দখল ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ থাকলেও অন্য মালিকদের (ব্যক্তিগত মালিকানা) ১২ দশমিক ১২ একর জমিসহ সানোয়ারা গ্রুপের মালিকানাধীন ২৪টি দাগের সর্বমোট ২০ দশমিক ৫৯ একর জমি বিতর্কিত। এ দাগগুলোর ওপর পটিয়া যুগ্ম জজ আদালত (চট্টগ্রাম) বিভাগ মামলা নং-২২০ চলমান রয়েছে। এছাড়া আরো ১৩টি ফৌজদারি মামলা থাকায় তা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ইকোনমিক জোন সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রম সমীচীন হবে না বলে গত ২৫ নভেম্বর চিঠি দেয় বেজার সহকারী ব্যবস্থাপক (ওএসএস ও সমন্বয়) দুর্জয় রায় পলাশ।

অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া দুই শিল্প গ্রুপের বক্তব্যেও পাওয়া গেছে ভিন্নতা। সানোয়ারা গ্রুপ দাবি করছে, পোলট্রি খাতে বিনিয়োগের কথা বলে কাজী ফার্মস তাদের জমিগুলো কিনেছিল। ১১২ একর জমির রেজিস্ট্রি দেয়া হলেও বাকি জমি এখনো দেয়া হয়নি। অর্থনৈতিক অঞ্চল হলে স্থানীয় কৃষি ব্যবস্থা বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এখন তাদের মালিকানায় থাকা জমিগুলো রেজিস্ট্রি দেবে না। স্থানীয় কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন ছাড়াও দিয়াকুলে একটি কৃষি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।

সানোয়ারা পোলট্রি অ্যান্ড হ্যাচারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, প্রায় এক দশক আগে বার্ড ফ্লুর কারণে আমাদের পোলট্রি খাতে বড় লোকসানের দায় এড়াতে দিয়াকুলের প্রকল্পের জমি বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ওই সময় কাজী ফার্মস বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়ে পোলট্রি খাতের বিনিয়োগের চুক্তি করে। পরবর্তী সময়ে তারা আমাদের জমি ক্রয় করে তিন ফসলি জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পরিকল্পনা করেছে। স্থানীয় মানুষ ও প্রকৃতির কথা বিবেচনায় নিয়ে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সম্প্রতি বেজাও দিয়াকুলে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের বিষয়টি স্থগিত রেখেছে।

অন্যদিকে কাজী ফার্মসের দাবি, সরকারিভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন পাওয়ার পর এখন পর্যন্ত ১১২ একর জমি সানোয়ারা গ্রুপের কাছ থেকে রেজিস্ট্রি আকারে বুঝে নিয়েছে তারা। তাছাড়া ব্যক্তিগত পর্যায়ে আরো প্রায় ১৮ একর জমিসহ মোট ১৩০ একর জমিতে গ্রুপটির মালিকানা ও দখল রয়েছে। এছাড়া সানোয়ারা গ্রুপের কাছে আরো ১৮০ একর জমির ক্রয়ে চুক্তি হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমতি সাপেক্ষে এসব জমি রেজিস্ট্রি করা হবে।

জানতে চাইলে কাজী ফার্মসের প্রকল্প প্রধান হাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে জানান, ইকোনমিক জোন স্থাপনে সরকারি কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে মামলাজনিত কারণে প্রকল্প এলাকায় কোনো কার্যক্রম না চালাতে নির্দেশনা রয়েছে। সানোয়ারা গ্রুপের কাছ থেকে শিগগিরই আরো ১৮০ একর জমি ক্রয়ের চূড়ান্ত রেজিস্ট্রি নেয়া হবে। এরপর সরকারি নিয়মনীতি পরিপালন সাপেক্ষে এখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। পরিত্যক্ত জমি হওয়ায় দিয়াকুল মৌজায় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে কোনো বাধা নেই বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে ফসলি জমি হারানোর শঙ্কায় রয়েছে উপজেলার দিয়াকুল মৌজার কয়েকশ কৃষক পরিবার। সম্প্রতি কৃষি জমি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের দিকে যাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। গত ২৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন ভুক্তভোগী স্থানীয় কয়েকশ কৃষক। তাদের দাবি, বংশপরম্পরায় চাষাবাদ করে আসা জমিতে শিল্প-কারখানা হলে কর্মসংস্থান হারাবে স্থানীয়রা।

চন্দনাইশের দোহাজারী পৌরসভার দিয়াকুল মৌজায় প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় পাঁচ শতাধিক পরিবার এখানকার জমিতে ধান, রবিশস্য উৎপাদনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। ব্যক্তিগত জমি ছাড়াও আগের মালিক প্রতিষ্ঠান সানোয়ারা গ্রুপের কাছ থেকে বর্গা নিয়ে এখানকার কৃষকরা চাষবাস করেন। প্রতি বিঘা জমির জন্য বর্তমানে বার্ষিক ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন তারা। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে স্থানীয় কৃষকরা ব্যক্তিগত জমির পাশাপাশি সানোয়ারা গ্রুপের কাছ থেকে জমি নিয়ে প্রতি বছর তিন ধরনের ফসল ফলান (আমন, বোরো ও রবিশস্য)। তবে নতুন করে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কার্যক্রম শুরুর পর অনেক কৃষক আগের মতো জমি পাচ্ছেন না।

স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, এখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়ার ঘোষণার পর কাজী গ্রুপ ১১২ একর জমির মালিকানা বুঝে নিয়েছে। আগে এসব জমি সানোয়ারা গ্রুপের কাছ থেকে বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে এলেও বর্তমানে দখলে নেয়া জমিতে বর্গা চাষের সুযোগ দিচ্ছে না কাজী গ্রুপ। এতে স্থানীয় শতাধিক কৃষক এরই মধ্যে তাদের চাষের জমি হারিয়েছেন।

শস্যভাণ্ডার খ্যাত দিয়াকুলে অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক নবাব আলী বণিক বার্তাকে বলেন, সরকার কৃষি জমিতে শিল্প-কারখানা স্থাপন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু শিল্প গ্রুপগুলো নিজের স্বার্থে শস্যভাণ্ডার দোহাজারীর উর্বর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। স্থানীয় কৃষকরা নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে এরই মধ্যে আন্দোলন শুরু করেছে। কেউ চাইলে কৃষিপণ্যভিত্তিক কার্যক্রম চালালে কৃষক ও স্থানীয়দের আপত্তি নেই। কিন্তু প্রাণ-প্রকৃতি নষ্ট করে ফসলি জমিতে শিল্প স্থাপনের বিরুদ্ধে কৃষকরা ভবিষ্যতে বৃহত্তর আন্দোলন করবেন বলে জানান তিনি।

গত রোববার সরেজমিনে চন্দনাইশের দিয়াকুল এলাকায় গেলে স্থানীয় কৃষক আবদুল আজিজ বণিক বার্তাকে জানান, বংশানুক্রমে দিয়াকুলের জমিতে নিজস্ব জমি ও বর্গা নিয়ে কৃষিকাজ করেন তারা। আগে সানোয়ারা গ্রুপের কাছ থেকে জমি বর্গা নিয়ে চাষ করলেও সম্প্রতি ইকোনমিক জোনের কারণে কিছু জমি কাজী ফার্মসের কাছে চলে গেছে। এ কারণে চাষাবাদ থেকে তাদের আয়ও কমে গেছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল হলে এখানকার ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ উচ্ছেদ হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রস্তাবিত ইকোনমিক জোন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কৃষকরা আমনের ধান তুলতে ব্যস্ত। যেসব জমি থেকে ধান উত্তোলন শেষ হয়েছে, সেখানে রবিশস্য বপন করা হয়েছে। দিয়াকুলের প্রায় শতভাগ জমিই এখন রবিশস্য যেমন শিম, লাউ, কুমড়া, বেগুন, মুলা, মরিচের ক্ষেত। অনেক নিম্নাঞ্চল ও পুকুর লিজ নিয়ে স্থানীয়রা মাছের চাষ করেছেন। তাছাড়া ইকোনমিক জোন এলাকায় এক-চতুর্থাংশ জমি পাহাড় ও টিলা হওয়ায় এখানে ঘন বনাঞ্চলও রয়েছে।