শয্যার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় একেকটি বেডে দুই থেকে তিন শিশুকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, প্রতিদিন শতাধিকের বেশি শিশু ভর্তি হচ্ছে, যার এক-চতুর্থাংশই হামের উপসর্গ নিয়ে। তাদের অনেকেই আবার নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শিশু ওয়ার্ডে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে আনুমানিক ৪৩৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

সরজমিনে চমেকের ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ড এবং ১ নম্বর হাম ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায় রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। কোনো বেড খালি নেই। বেশির ভাগ বেডেই দুই থেকে তিনজন রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শিশুদের হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা নিয়ে এক বেড থেকে অন্য বেডে ছুটছেন আয়া বা নার্সরা। বাচ্চার চিকিৎসার জন্য এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছেন অভিভাবকরা। অনেকেই ফোনে চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য টাকা সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এছাড়া আয়া বা ওয়ার্ডবয়দের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায়ও জড়াতে দেখা গেছে ভুক্তভোগী অভিভাবকদের।

শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, গত মঙ্গলবার ও বুধবার বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে চমেকে ভর্তি হয়েছে প্রায় ২৩০ জন, যার মধ্যে মঙ্গলবার ৩৫ জন ও বুধবার ২১ জনসহ মোট ৫৬ জন শুধু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ২৫ জন, ১ নম্বর হাম ওয়ার্ডে ৮৬ জন এবং আইসিইউতে ১৫ জনসহ মোট ১২৬ জন হামের উপসর্গ ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। অন্যান্য রোগেও আরো ভর্তি হয়েছে। বুধবারের পরিসংখ্যানে দুই শিশু মারা গেছে, যাদের হামের উপসর্গ ও নিউমোনিয়া ছিল। এখন প্রতিদিন গড়ে ১০০-১২০ শিশু চমেকে ভর্তি হচ্ছে।

চমেকের শিশু ওয়ার্ডের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৬৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৬০, মার্চে ৭০ ও এপ্রিলে ৯০ জনসহ মোট ২৮৫ জন হামের উপসর্গ, নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়ায় মারা গেছে। অন্যদিকে মে থেকে জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে আরো অন্তত ১৫০ শিশু মারা গেছে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৪৩৫ জনের মতো মারা গেছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১২ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। মারা যাওয়া শিশুর বেশির ভাগই নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্টজনিত রোগে মারা গেছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বরতরা।

চলতি মাসের ১১ তারিখ থেকে প্রায় সাতদিন চমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেও ২৬ তারিখে আবারো চিকিৎসা নিতে এসেছে চার মাসের শিশু মাহাদী। নগরীর কল্পলোকের বাসিন্দা মাহাদীর বাবা মঞ্জুর আলম জানান, মাসের শুরুতে শ্বাসকষ্ট, গায়ে ব্যথা, কিছু না খাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে প্রায় সাতদিন চিকিৎসা শেষে বাড়ি নিয়ে গেলেও কয়েক দিনে বাচ্চার গায়ে গুটি গুটি উঠেছে। পরে তা সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। হয়তো হামের উপসর্গ আছে। সে কারণে আবার হাসপাতালে নিয়ে এসেছি দুইদিন আগে।

চমেকের ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছে ইকরা (চার মাস)। তার বাবা মোহাম্মদ পারভেজ জানান, চার থেকে পাঁচদিন ধরে বাচ্চাটি অসুস্থ। হামের উপসর্গ আছে কিনা সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে বাচ্চার শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা ছিল।

অভিভাবকরা জানান, হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক বেশি। রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এক বেডে তিনজনের বেশি শিশুকে রেখে চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে। শিশুদের সঙ্গে আসা মায়েরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তাদের অভিযোগ, ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। কিছু ওষুধ হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে দেয়া হলেও তার পরিমাণ কম। অনেকেই টাকার অভাবে ওষুধ বা স্যালাইন কিনতে পারছেন না। রোগী বেশি হওয়ায় নার্স বা চিকিৎসকদের ডেকেও পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া ওয়ার্ডবয় বা আয়ারা বাড়তি টাকা না দিলে কাজ করতে চান না। বিনামূল্যের চিকিৎসার কথা বলা হয় সেভাবে কিছুই পাওয়া যায় না।

চমেক হাসপাতালের নিচতলায় ১ নম্বর ওয়ার্ডের চিকিৎসক নুজহাত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওয়ার্ডটি হাম চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এ ওয়ার্ডে ৩৬টি বেড থাকলেও এখন প্রায় ৮৬ জনকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আইসিইউতেও কোনো সিট খালি নেই।’

চমেকের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মোহাম্মদ মুছা মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওয়ার্ডে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। প্রতিদিনই গড়ে শতাধিকের বেশি শিশু চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতালে আসছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত রোগীরাও আছে। এদের অনেকেই নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। শুধু হামের উপসর্গ নিয়ে যারা আসছে, তাদের আলাদা ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। তবে নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যাই বেশি। রোগী বেশি হওয়ায় চিকিৎসক ও নার্সদের কাজের চাপ বেড়েছে। সরকার থেকে হামের ভ্যাকসিন দেয়া হচ্ছে। সবাইকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা গেলে রোগীর সংখ্যা কমে যাবে।’

এদিকে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে বুধবার সকাল ১০টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫৪ জন হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে নগরীতে ৫০ ও উপজেলায় চারজন। এখন বিভিন্ন হাসপাতালে ২৫১ জন চিকিৎসা নিচ্ছে। নমুনা পরীক্ষায় চট্টগ্রামে গতকাল ১৮ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। গত ২৯ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায় সন্দেহভাজন হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৫ হাজার ১৯৮ জন। তবে ৪ হাজার ৯৪৭ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। ১ হাজার ৮৯২টি হামের উপসর্গের নমুনা ঢাকায় পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ৪৬ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। সন্দেহভাজন মোট ১২ জন হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন হাসপাতালে শিশুরা চিকিৎসা নিতে আসছে। কয়েক মাস আগের তুলনায় এখন পরিস্থিতি বেশ ভালো। সরকারের নির্দেশে নগরী ও উপজেলাগুলোয় হামের ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। আবহাওয়া পরিবর্তন, অপুষ্টিজনিতসহ বিভিন্ন কারণে শিশুরা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এতে নিউমোনিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। তবে চিকিৎসকরা শিশুদের সেবা দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।’