সৌদি আরবে ওমরাহ পালনের জন্য গত বছরের জানুয়ারিতে মারুফ ট্রাভেলস নামে একটি এজেন্সিতে যোগাযোগ করেন ইসতিয়াক জহির। সব প্রক্রিয়া সম্পাদনের পর এজেন্সির মাধ্যমে ফেব্রুয়ারিতে ভিসা পান তিনি। মার্চে ওমরাহ পালনে সৌদি আরব যাওয়ার জন্য উড়োজাহাজের টিকিটও ক্রয় করেন। তবে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করেই সৌদি আরব ওমরাহ ভিসা বাতিল করায় শেষ পর্যন্ত ওমরাহ করা হয়নি ইসতিয়াকের। অনেক আগেই সৌদি কর্তৃপক্ষ ওমরাহ ভিসা ফি ফেরত দিলেও এখনো এজেন্সি থেকে সে অর্থ আদায় করতে পারেননি ইসতিয়াক।

ইসতিয়াক বলছেন, সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী ওমরাহ গমনেচ্ছুদের কাছ থেকে নেয়া ভিসা ও অন্যান্য সার্ভিস ফি ফেরত পাওয়ার কথা। এজন্য একাধিকবার এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রতিবারই তারা জানায়, সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনো অর্থ ফেরত দেয়নি। সে কারণে ভিসা ফির টাকা ফেরত দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

ওমরাহ ভিসা ফির অর্থ ফেরত পাননি রেজাউল করিমও, যিনি গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ওমরাহ ভিসা করেছিলেন। গতকাল তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, মার্চের মাঝামাঝি ওমরাহ করার নিয়ত ছিল। এজন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের টিকিটও কেনা ছিল। সৌদি সিদ্ধান্তের কারণে ফ্লাইট না চলায় এরই মধ্যে টিকিটের অর্থ ফেরত দিয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ। তবে ওমরাহ ভিসার ফি এবং সার্ভিস চার্জ বাবদ ২০ হাজার টাকা এখনো ফেরত দেয়নি হজ এজেন্সি।

করোনাভাইরাস ঠেকাতে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ওমরাহ ও পর্যটক ভিসা স্থগিত করার ঘোষণা দেয় সৌদি আরব। এ কারণে ১০ হাজার বাংলাদেশী ভিসা করেও ওমরাহ পালনে যেতে পারেননি। তবে গত ১ মার্চ এক বিবৃতিতে সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানায়, যারা ওমরাহ করার টাকা জমা দিয়েও সাময়িক নিষেধাজ্ঞার কারণে সৌদি আরবে আসতে পারছেন না, স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে তাদের সেই টাকা ফেরত দেয়া হবে। এ ঘোষণার পর গত বছরই নিজ নিজ হজ এজেন্সির অ্যাকাউন্টে চলে এসেছে এ অর্থ। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো অনেক এজেন্সি ওমরাহ গমনেচ্ছুদের ভিসা ফির অর্থ ফেরত দেয়নি।

হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, অতীতে সৌদি আরব কখনই ভিসা ফি বাবদ টাকা ফেরত দেয়নি। তবে করোনাভাইরাসের সংকটকালীন প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত বছর ফেব্রুয়ারি বা তার আগে ওমরাহ ভিসা করার পরও সৌদি সিদ্ধান্তের কারণে যেতে পারেননি তাদের সবার ভিসা ফি ফেরত দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ, যা হজ এজেন্সিগুলো অনেক আগেই বুঝে পেয়েছে। আর হজ এজেন্সির মাধ্যমে ওমরাহ গমনেচ্ছুকরাও সে অর্থ ফেরত পেয়েছেন। এক্ষেত্রে সার্ভিস চার্জ বাবদও কোনো অর্থ কেটে রাখা হয়নি।

তিনি বলেন, অনেক ওমরাহ গমনেচ্ছুক ভিসা করেন দালাল বা তৃতীয় কোনো এজেন্সির মাধ্যমে। যদি কোনো ওমরাহ গমনেচ্ছু ভিসার অর্থ ফেরত না পেয়ে থাকেন, তাহলে বুঝতে হবে দালাল তাকে ঠকাচ্ছেন। এ ধরনের কোনো তথ্য পেলে হাবের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, গত বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করেই ওমরাহ ভিসা বাতিল করে সৌদি আরব। ওইদিন সকাল থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমিরেটস এয়ারলাইনসের ইকে-৫৮৩, কাতার এয়ারওয়েজের কিউআর-৬৪১, এয়ার অ্যারাবিয়ার জি৯-৫১৮, সৌদি এয়ারলাইনসের এসভি-৮০৯ এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-০৪৯ ফ্লাইটে তিন শতাধিক ওমরাহযাত্রীর জেদ্দা ও মদিনা যাওয়ার কথা ছিল। সৌদি সরকারের হঠাৎ সিদ্ধান্তে তারা শাহজালালে এসে ভোগান্তিতে পড়েন।

সে সময় হজ এজেন্সিগুলোর সংগঠন হাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রায় ১০ হাজার ওমরাহযাত্রীর ভিসা করা আছে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার যাত্রীর বিমানের টিকিটও কাটা হয়েছে। ভিসা করার আগে সৌদিতে থাকার হোটেলের জন্য অগ্রিম টাকা দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়েছে এজেন্সিগুলো।

এদিকে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে টানা প্রায় আট মাস বন্ধ থাকার পর গত ৪ অক্টোবর থেকে সীমিত পরিসরে শর্তসাপেক্ষে ওমরাহ হজ কার্যক্রম শুরু করে সৌদি সরকার। প্রথম পর্যায়ে শুধু সৌদিতে অবস্থানরতদের জন্য ও দ্বিতীয় দফায় বিশ্বের স্বল্পসংখ্যক দেশ থেকে ওমরাহ পালনে ইচ্ছুক মুসল্লিদের অনুমতি দেয় সৌদি আরব। আর গত ১ নভেম্বর তৃতীয় ধাপে বিদেশীদের ওমরাহর সুযোগ দেয় দেশটি। তবে বিদেশী যাত্রীদের জন্য ওমরাহ ভিসা উন্মুক্ত করলেও সে সময় ওই সুবিধা পায়নি বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে মহামারী করোনা প্রাদুর্ভাব পুনরায় নতুন আকারে শুরু হওয়ায় বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থগিত করার পাশাপাশি পুনরায় ওমরাহ কার্যক্রম স্থগিত করে সৌদি আরব।