গতকাল রাজধানীতে বণিক বার্তা ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয় ও টেকসই প্রতিরোধের রূপরেখা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব পরামর্শ দেন। বণিক বার্তার নিজস্ব কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গোলটেবিলটি সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সহকারী সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ বিশেষ সংবাদদাতা মো. বদরুল আলম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘হামের কারণে যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের অনেকেই মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছিল। অপুষ্টি এবং সংক্রমণ একে অপরকে আরো জটিল করে তোলে। তাই এ দুটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে সরকার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুদের আইসোলেশন, অভিভাবকদের সচেতন করা এবং গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। তার পরও কিছু সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। ভাইরাসে কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা, বর্তমান টিকা আগের মতো কার্যকর রয়েছে কিনা—এসব বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। ভবিষ্যতের প্রতিরোধ ও চিকিৎসা কৌশল নির্ধারণে এসব গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ হবে।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল অনুবিভাগ) এএনএম মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘টিকাদানের ক্ষেত্রে টার্গেট এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে যে ঘাটতি রয়েছে, তা আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। অনেক সময় শহর অঞ্চলের বস্তি এলাকা বা দুর্গম অঞ্চলে আমরা সহজে পৌঁছতে পারি না। এ কারণে আমরা ‘‌‘‌মপ-আপ’’ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছি। এর মাধ্যমে প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে, যাতে একটি শিশুও টিকার আওতার বাইরে না থাকে।’

হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশুমৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা) ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘টিকার কোনো অভাব ছিল না, সমস্যা ছিল ব্যবস্থাপনায়। আমাদের নজরদারি ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। আইইডিসিআর মূলত রেসপন্স নিয়ে কাজ করে, কিন্তু ঢাকার বাইরে তাদের কার্যকর কোনো সার্ভেইল্যান্স নেটওয়ার্ক নেই। মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্র উঠে না আসায় মানুষ অনেক পরে বিপদের কথা জানতে পারে। এছাড়া মায়েদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়াও শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার একটি বড় কারণ হতে পারে।’

ইউনিকো হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (পেডিয়াট্রিক্স অ্যান্ড নিওনেটোলজি) ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ মেমেহ্লা মারমা বলেন, ‘এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো টিকা সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেয়া। আমরা দেখেছি, শুধু বস্তি এলাকা বা দুর্গম অঞ্চলেই নয়, শহরের অনেক উচ্চশিক্ষিত পরিবারের মধ্যেও টিকা নিয়ে ভুল ধারণা বা অনাস্থা কাজ করছে। তারা অনেক সময় সঠিক তথ্যের অভাবে টিকা নিতে চান না। শহরের সচেতন মহলের দিকেও আমাদের বিশেষ নজর দিতে হবে।’

স্কয়ার হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আহমেদ সাঈদ বলেন, ‘নবজাতক, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, যাদের ক্রনিক ইলনেস, হার্ট ডিজিজ বা ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ আছে, তারা সবচেয়ে বেশি হামের ঝুঁকিতে থাকে। এ শিশুদের ক্যাচ-আপ ইমিউনাইজেশন নিয়ে আমরা মাঠপর্যায়ে খুব বেশি কার্যকর ফলাফল দেখছি না। একটি কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থার জন্য আমাদের অবশ্যই ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক রেজিস্টার সিস্টেমে যেতে হবে।’

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) মেডিকেল অফিসার ডা. মো. ফয়জুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে আইইডিসিআরের নেতৃত্বে ন্যাশনাল র‍্যাপিড রেসপন্স টিম এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও রেসপন্স টিম কাজ করছে। মাঠপর্যায়ে যারা কাজ করছেন তাদের সঠিক ওরিয়েন্টেশনের ক্ষেত্রে কিছুটা ঘাটতি ছিল। সেটি দূর করতে আমরা উপজেলা রেসপন্স টিমগুলোকে নতুন করে সক্রিয় বা রিভাইটালাইজ করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো তারা যেন যেকোনো আউটব্রেক শনাক্ত করতে পারে, সঠিক কেস রিপোর্টিং ফরম পূরণ করতে পারে এবং কন্টাক্ট লিস্ট তৈরি করে আইইডিসিআরের কাছে দ্রুত “‍স্পট রিপোর্ট” পাঠাতে পারে।’

হাম প্রতিরোধে বর্তমানে সমন্বয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেন ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক ও বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. এমএ সামাদ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির একটি বিশাল ওয়ার্কফোর্স রয়েছে। আপনারা যদি আমাদের কোনোভাবে সম্পৃক্ত করেন, আমরা যদি একসঙ্গে কাজ করতে পারি, তাহলে অন্তত সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রোগের সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারব।’

টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগেরও বেশি অর্জিত হওয়ার পরও হামের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি কমেনি জানিয়ে হেলথ অ্যান্ড হোপ হসপিটালের চেয়ারম্যান ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এমএইচ চৌধুরী লেলিন বলেন, ‘এর কারণ হিসাবের বাইরের শিশু এবং টিকা না পাওয়া মায়েদের বিষয়টি বিবেচনায় আনা হয়নি। আরেকটি বড় বিষয় হলো ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট। স্বাস্থ্য খাতে দায়িত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে।’

চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলি বলেন, ‘কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনে আমরা সুস্পষ্টভাবে প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে ক্লিনিক্যাল সার্ভিসের পাশাপাশি পাবলিক হেলথ ও প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের জন্য পৃথক মহাপরিচালকের (ডিজি) অধীনে একটি শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।’

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ডা. লামিসা রহমান বলেন, ‘বর্তমানে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা কিছু উদ্বেগজনক বিষয় লক্ষ করছি। কোথাও কোথাও টিকার মেয়াদ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এর ফলে মানুষের আস্থার জায়গা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং অনেক অভিভাবক শিশুদের টিকা দিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ আস্থার সংকট দূর করতে কার্যকর গণযোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি।’

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর হেলথ পপুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পরিচালক ডা. এসএম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পোস্ট-ক্যাম্পেইন মনিটরিং। প্রতিটি টিকাদান কর্মসূচির পর এটি বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা এখনো সেই মূল্যায়ন শেষ করতে পারিনি। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে আসা অন্য শিশুদের খুঁজে বের করা বা কন্টাক্ট ট্রেসিংও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কভিডের সময় আমরা যেভাবে ব্যাপকভাবে কন্টাক্ট ট্রেসিং করেছি, হামের ক্ষেত্রেও সে ধরনের কার্যক্রম প্রয়োজন।’

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ডা. মো. জহিরুল আলম আজাদ বলেন, ‘প্রতিটি টিকাদান ক্যাম্পেইনের পর বাধ্যতামূলকভাবে ডোর টু ডোর সার্চিং পরিচালনা করা উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ যেসব ঘনবসতিপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ নগর এলাকা চিহ্নিত করেছে, সেখানে নিয়মিত বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে খসড়া অবস্থায় থাকা জাতীয় ইমিউনাইজেশন নীতি দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে।’

শুধু শিশুদের নয়, মায়েদের টিকাপ্রাপ্তির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে বলে মনে করেন ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড এনআইসিইউ বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. আজমেরী সুলতানা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘যদি কোনো মা আগে টিকা না পেয়ে থাকেন, তাহলে ভবিষ্যতে তার সন্তানও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। গর্ভধারণের আগে নারীদের টিকাদান নিশ্চিত করা উচিত।’

এর আগে শুভেচ্ছা বক্তব্যে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় আজকের আলোচনায় যে টেকসই রূপরেখা ও সুপারিশমালা উঠে এসেছে, সেগুলোর অনেকগুলোই খুব সহজে এবং স্বল্প ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। সরকারি পর্যায়ে বর্তমানে যে প্রস্তুতি ও পদক্ষেপগুলো নেয়া হচ্ছে তা আশাব্যঞ্জক, তবে এ কার্যক্রমে আরো গতিশীলতা আনা জরুরি।’

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন দৈনিক বণিক বার্তার প্রকাশক ও সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ বিশ্বের জন্য একটি উদাহরণ। কিন্তু হামের প্রাদুর্ভাবে সে গর্ব অনেকটাই ভেঙে গেছে। শুধু ভ্যাকসিনের ঘাটতিই নয়, যেসব শিশু চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেছে, তাদের সবাইকেও আমরা বাঁচাতে পারিনি। অর্থাৎ আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’