কেজিতে ২ টাকা বাড়িয়েও ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি যশোর খাদ্য বিভাগ। আমন মৌসুমে মাত্র ৭ দশমিক ৯২ শতাংশ ধান সংগ্রহ হয়েছে। তবে চাল সংগ্রহ হয়েছে ৯৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে ধানের দাম বেশি থাকা ও গুদামে বিভিন্ন জটিলতার কারণে খাদ্য গুদামে ধান বিক্রিতে আগ্রহী হননি কৃষক।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষকের কাছ থেকে ৫ হাজার ২৮৩ টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৪১৮ দশমিক ৬৪০ টন। চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ হাজার ৮৭১ টন। এর মধ্যে সিদ্ধ চাল ১৪ হাজার ৪৬৭ টন এবং আতপ চাল ৪০৪ টন। চাল সংগ্রহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৫৯৪ টন।

গত ২৩ নভেম্বর থেকে ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু করা হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি এ অভিযান শেষ হয়েছে। এ সময়ে সিদ্ধ চাল সরবরাহের জন্য ১০২ চালকল মালিক এবং আতপ চাল সরবরাহের জন্য একজন চালকল মালিক চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। সিদ্ধ চাল ৪৪ টাকা, আতপ ৪৩ এবং ধান ৩০ টাকা কেজি দরে কেনা হয়েছে।

দাম বাড়িয়েও ধান সংগ্রহ আশানুরূপ না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে যশোর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যানন্দ কুণ্ডু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমন সংগ্রহ অভিযানে সরকারিভাবে ধানের যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, স্থানীয় বাজারে তার চেয়ে কিছুটা বেশি দামে বেচাকেনা হয়েছে। অভিযানের শুরুতে বাজারে ধানের দাম কম ছিল। তখন কিছু ধান সংগ্রহ হয়েছে। খাদ্যগুদামগুলো উপজেলা সদরে হওয়ায় ধান পরিবহনে কৃষকের ব্যয় বাড়ে। শ্রম ও সময় বেশি লাগে। এজন্য কৃষক বাড়ি থেকে এবং পাশের বাজারে প্রায় একই দামে ধান বিক্রি করেছে। এতে পরিবহন ব্যয়, শ্রম ও সময় কম লেগেছে। এ কারণে কৃষক খাদ্য গুদামে ধান সরবরাহ করতে আগ্রহী হয়নি। তবে প্রথমে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ হাজার ২০ টন। সেখানে আমরা লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে সংগ্রহ করেছি ১৩ হাজার ৫৯৪ টন। ফলে ধান সংগ্রহ কম হলেও কোনো সংকট হবে না।’

জেলা খাদ্য বিভাগ সূত্র জানায়, একজন কৃষক সর্বনিম্ন ১২০ থেকে সর্বোচ্চ তিন টন পর্যন্ত ধান সরকারি গুদামে বিক্রি করতে পারেন। ধান কেনার পর গুদাম থেকে কৃষককে ওজন মান মজুদ সনদ দেয়া হয়। কৃষক ওই সনদ ব্যাংকে তার নিজস্ব ১০ টাকা হিসাবে জমা করার পর চেক দিয়ে ধান বিক্রির টাকা তোলেন। কিন্তু বাজার থেকে খাদ্য গুদামগুলো দূরে হওয়ায় পরিবহন খরচ বাঁচাতে কৃষক সরকারের গুদামে ধান দিতে আগ্রহ দেখায়নি।

জেলার আটটি উপজেলার মধ্যে সদর, শার্শা, চৌগাছা, ঝিকরগাছা, মণিরামপুর, বাঘারপাড়া এবং কেশবপুর উপজেলায় কৃষি অ্যাপের মাধ্যমে এবং অভয়নগর উপজেলায় ‘আগে আসলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা হয়েছে। ২০১০ সালে কৃষি বিভাগ কৃষকদের তালিকা তৈরি করে। এরপর তালিকাভুক্ত কৃষককে কৃষি কার্ড দেয়া হয়। কিন্তু তালিকাটি পরে আর হালনাগাদ করা হয়নি। ফলে নতুন করে ধান চাষ করা কৃষক তালিকাভুক্ত হননি।

কৃষকের অভিযোগ, গুদামে ধান দিতে গেলে সমস্যায় পড়তে হয়। ধান নিয়ে গেলে ওই কৃষকের নাম উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের কৃষকের তালিকায় আছে কিনা, তা দেখা হয়। তালিকায় নাম না থাকলে কৃষক গুদামে ধান বিক্রি করতে পারেন না। খাদ্য গুদামে শুধু ১৪ শতাংশের নিচের আর্দ্রতার ধান কেনা হয়। কৃষক গুদামে ধান নিয়ে গেলে আর্দ্রতার অজুহাতে ফেরত দেয়া হয়। এ কারণে গুদামে ধান দিতে গিয়ে কৃষকের লোকসান হয়। এছাড়া ধানের মান খুব ভালো না হলে কেনা হয় না। তবে ধানের মান কিছুটা খারাপ হলেও কৃষক বাজারে যাচাই করে ধান বিক্রি করতে পারেন।

গুদামে ধান সরবরাহ না করার কারণ জানতে চাইলে ঝিকরগাছার মাটিকুমড়া গ্রামের গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘গুদামে ধান বিক্রি করা বেশ ঝামেলার। তাছাড়া মোটা এবং চিকন ধানের বাজার দর সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি। গুদামে ধান পৌঁছে দিতে পরিবহন খরচ বেশি পড়ে, শ্রম এবং সময়ও লাগে বেশি। এজন্য কৃষক গুদামে ধান বিক্রি করতে চান না।’

অভয়নগর উপজেলার বগুড়াতলা গ্রামের কৃষক শেখ নূর আলম বলেন, ‘সরকারি গুদামে ধান দিতে খুব ঝামেলা হয়। বাড়ি এবং স্থানীয় বাজারে ধান বিক্রিতে কোনো ঝামেলা নেই। দামও ভালো। এজন্য গুদামে ধান বিক্রি করিনি।’