রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ভেজাল ও অনুমোদনহীন ওষুধ তৈরির অভিযোগে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা ওয়ারী বিভাগ (ডিবি)। অভিযানে শিশুদের ব্যবহারের ওষুধসহ বিভিন্ন ধরনের সিরাপ, ক্যাপসুল, শ্যাম্পু, ফেসওয়াশ, হাইজিন ওয়াশ, সাবান, পাউডার ও ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে। এসব সামগ্রীর বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা বলে ডিবি জানিয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা উদ্যান রোডের ব্লক-সি এলাকার একটি ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন আব্দুল্লা আল-মামুন (৪২), মো. সাজু (৩৩) ও মো. সজীব (২৬)। আজ বুধবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ওই ফ্ল্যাট থেকে বিপুল পরিমাণ ভেজাল ও অনুমোদনহীন ওষুধ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে শিশুদের ব্যবহারের কয়েকটি সিরাপ ও লিকুইড পণ্য রয়েছে। এসব পণ্য শিশুদের জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ডিবি জানায়, অভিযানে পাওয়া কিছু ওষুধ দেশে প্রচলিত নয়। এসব ওষুধ প্রতিবেশী দেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসকের মাধ্যমে এসব ওষুধ রোগীদের প্রেসক্রাইব করানো হতো বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

অনুমোদনহীন ওষুধ চিকিৎসকদের মাধ্যমে প্রেসক্রাইব করার বিষয়ে জানতে চাইলে মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমোদনহীন কোনো ওষুধ চিকিৎসকরা প্রেসক্রাইব করতে পারেন না। তদন্তে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের নাম পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অভিযানে প্রায় এক কোটি টাকার ওষুধ জব্দের বিষয়ে তিনি বলেন, চক্রটি এ পর্যন্ত বাজারে কত টাকার ওষুধ সরবরাহ করেছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অভিযানে পাওয়া কাগজপত্রও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। জব্দ করা বিদেশী ওষুধ দেশে বৈধভাবে আমদানি করা হয়েছে কিনা, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

শিশুদের ব্যবহারের জব্দ করা ওষুধের মধ্যে কিডোকেয়ার নামে একটি সিরাপকে নকল বলে উল্লেখ করেছে ডিবি। এছাড়া KIDZ Omega ও ভিটামিন ডি৩-সংক্রান্ত কিছু ওষুধও উদ্ধার করা হয়েছে।

ভেজাল ওষুধ কীভাবে শনাক্ত করা যায়—এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবির এ কর্মকর্তা বলেন, ভেজাল ওষুধ চেনা অত্যন্ত কঠিন। তবে ওষুধের মোড়ক ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্যাকেজিং ভালোভাবে দেখলে অনেক ক্ষেত্রে তা শনাক্ত করা সম্ভব।

মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, চক্রটি কার কাছে ওষুধ বিক্রি করেছে, কোথায় সরবরাহ করেছে এবং কোনো ডিসপেনসারি বা বিক্রয়কেন্দ্রে এসব ওষুধ রয়েছে কিনা, তা তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ব্যক্তিরা প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন মাস ধরে এ ব্যবসা করার কথা জানিয়েছেন। যে বাসাটি ব্যবহার করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল, সেটিও প্রায় তিন মাস আগে ভাড়া নেয়া হয়েছিল।

চক্রটির নেটওয়ার্ক সারা দেশে রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তাদের কার্যক্রম ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

ডিবি জানায়, ভেজাল ওষুধ ক্রয়-বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে নিজেদের হেফাজতে রাখার অভিযোগে গ্রেফতার তিনজনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়েছে।

অভিযানে জব্দ করা সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ১৯২টি KIDZ Omega Liquid 100ml সিরাপ, ১০০ বক্স LACTOFLEX Capsules, ৩০টি Facy GLOW Face Wash, ১৫০টি Detox Plus Shampoo, ৭০টি Pedia Vox Kid Syrup, ৩০০ পাতা Osearc-CD ক্যাপসুল, ৫ কেজি Oriva Hapes সাদা পাউডার, ৫০টি BIOKET Active Shampoo, ৮০০টি KIDICARE Syrup Plus 100ml, ৭০টি ZERO DAN Shampoo, ৪০টি KETCOR-Z Shampoo ও ১০টি Nutramide Syrup।

১৫০টি INTA CLEAN HYGIENE WASH-এর খালি মোড়ক, মোড়কবিহীন ৮০ বোতল Hygiene Wash, ৩০০টি PERMIMITE Soap-এর খালি মোড়ক, ৮০টি Spiruva (Spirulina) লিফলেট, ১০০টি ফেসওয়াশের পলিথিন, ৩০০টি লেবেলবিহীন সিরাপের বোতল, ৪০০টি সাদা প্লাস্টিকের কৌটা, ১০০টি লেবেলবিহীন সাদা ট্যাবলেট এবং ৫০০টি সবুজ রঙের খালি ক্যাপসুল সেল উদ্ধার করা হয়েছে।

এছাড়া ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত তিনটি সিলিন্ডার, একটি ফুয়েল লাগানোর মেশিন, দুটি ক্যাপসুল ভরার মেশিন, ১০ কেজি ফুয়েল (পলিথিন), ছয়টি ক্যাপসুল ভরার যন্ত্রাংশ এবং দুটি লেবেল লাগানোর সাঁচও জব্দ করা হয়েছে।