ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরো ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। আর হামের উপসর্গে মারা গেছে আরো তিন শিশু। গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় দুই রোগে এ মৃত্যু হয়। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত পৃথক বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এ সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৫৬১ জন। আর একই সময়ে ৯০৫ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। ৬৩ জনের নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ রোগ নিয়ে হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছে ৮২২ জন।
বছরের শুরুতে হামের প্রাদুর্ভাবের পর বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। হামে আক্রান্তদের বড় অংশ শিশু হলেও ডেঙ্গুতে বিভিন্ন বয়সী মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপের পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রীর চাহিদাও বাড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকে। এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত এক মাসে দেশে ১৯ হাজার ১৬১টি সন্দেহভাজন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে পরীক্ষায় ২ হাজার ৯৭৩ জনের নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়। একই সময়ে হামজনিত ১৬৬টি সন্দেহভাজন মৃত্যু ও ৩০টি নিশ্চিত মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়।
পরবর্তী সময়ে ইউনিসেফের তথ্যে সংক্রমণের ব্যাপ্তি আরো স্পষ্ট হয়। জুনের শেষ নাগাদ দেশে এক লাখের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী এবং ৬২৫টি সন্দেহভাজন মৃত্যুর তথ্য রিপোর্ট করা হয়। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সহায়তায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করে সরকার। ফলে টিকার আওতায় আসে প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশু।
গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৫৪৩ জন। এছাড়া নিশ্চিত হামরোগী শনাক্ত হয়েছে ২০ হাজার ৬৯ জন। ১ লাখ ৫১ হাজার ২৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ সময় সন্দেহজনক হামে ৯২২ জন এবং নিশ্চিত হামে ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
হামে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। আক্রান্তদের প্রায় ৭৯ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকি বেশি। নয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এ বয়সের অনেক শিশু নিয়মিত হাম-রুবেলা টিকার নির্ধারিত বয়সে না পৌঁছায় তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি ও দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ এবারের হামের প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ। টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের একটি অংশ পর্যাপ্ত সুরক্ষা না পাওয়ায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
হামের প্রাদুর্ভাবের রেশ কাটতে না কাটতেই বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বৃষ্টির পর বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫১ হাজার ৮৩৭ জন। এ রোগে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৯-এ। চলতি মাসে সংক্রমণ ও মৃত্যু বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, আগস্টে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল ৪৩ জনের। আর চলতি মাসের প্রথম ১২ দিনেই মারা গেছেন ৫২ জন। জুলাইয়ে মৃত্যু হয় ৩৬ জনের।
হাম ও ডেঙ্গুর চিকিৎসা পদ্ধতি আলাদা হলেও একই সময়ে দুটি সংক্রামক রোগের প্রকোপ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে শিশুদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালগুলোয় হামের রোগীর চাপ বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক ও নার্সের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে ওষুধ, আইভি স্যালাইন, অক্সিজেনসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রীর চাহিদা বাড়ছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় স্যালাইনের চাহিদা যেমন বাড়ছে, তেমনি গুরুতর অবস্থায় থাকা হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে বাড়তি জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম।
হাম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি আরো শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনার পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে যাতে ভবিষ্যতে ঘাটতি তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার ভ্যাকসিনেশনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। হাসপাতাল ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রেও করা উচিত।’
তার মতে, টিকাদানের পাশাপাশি রোগী ব্যবস্থাপনায়ও প্রস্তুতি বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ সংক্রমণ বাড়লে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ সামাল দিতে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় জনবল, শয্যা ও চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
হাম ও ডেঙ্গুর একসঙ্গে বিস্তার মোকাবেলায় সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র গঠনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘হাম ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র গঠন করা প্রয়োজন। গতানুগতিক পদ্ধতিতে এ পরিস্থিতির সমাধান করা সম্ভব নয়।’
তার মতে, দুই রোগের জন্য পৃথক হাসপাতাল বা পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করা গেলে রোগী ব্যবস্থাপনা সহজ হবে এবং মৃত্যুহার কমানো সম্ভব হতে পারে।










