পুলটি ফরাশগঞ্জ ও গেন্ডারিয়াকে সংযুক্ত করেছিল। এর কিছুটা আগে ছিল আরেকটি বড় কাঠের পুল। এ দুই পুলের নিচ দিয়ে বয়ে যেত ঢাকার অন্যতম বড় খাল ‘ধোলাইখাল’। একসময় এ খালই ছিল ঢাকার বাণিজ্যিক যোগাযোগের অন্যতম পথ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাণিজ্যিক নৌযান ধোলাইখালের বুক চিরে চলাচল করত।

বুড়িগঙ্গা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে ধোলাইখাল দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এর একটি শাখা যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী ও ডেমরা খাল হয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে মিশেছে। অন্য শাখাটি মতিঝিল, শাহবাগ ও কারওয়ান বাজার হয়ে বেগুনবাড়ি খাল—অর্থাৎ বর্তমান হাতিরঝিলের মধ্য দিয়ে বালু নদে গিয়ে মিশেছে। বর্তমানে কাগজে-কলমে ও এলাকার নামে ধোলাইখাল টিকে থাকলেও বাস্তবে এর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। খোদ সরকারি সংস্থাই খালটি ভরাট করে বাজার, কমিউনিটি সেন্টার ও শরীরচর্চা কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। এছাড়া খালটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখলদারের কবলে রয়েছে। খোদ ঢাকা জেলা প্রশাসনের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। তবে খালটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) জানিয়েছে, আপাতত এটি পুনরুদ্ধারের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ধোলাইখালের দখলদারদের একটি বিস্তারিত তালিকা প্রণয়ন করে ঢাকা জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সালমা খাতুনের নেতৃত্বে তালিকাটি তৈরি করা হয়। এতে ধোলাইখালের দৈর্ঘ্য সাত কিলোমিটার এবং খালটি ৯৭ ব্যক্তির দখলে থাকার তথ্য উঠে আসে। তালিকা অনুযায়ী, সূত্রাপুরের বড় একটি অংশ খালের জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে।

জেলা প্রশাসনের তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ধোলাইখাল দখল করে অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে খোদ ঢাকা সিটি করপোরেশন। অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের আমলে খালের জায়গায় বাজার, কমিউনিটি সেন্টার ও শরীরচর্চা কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।

গতকাল সরজমিনে সূত্রাপুর থানার পেছনে তিনতলা সূত্রাপুর কমিউনিটি সেন্টার, সূত্রাপুর বাজার এবং সিটি করপোরেশনের আধুনিক শরীরচর্চা কেন্দ্রের তিনতলা ভবন দেখা যায়। সেখানে বেসরকারিভাবে নির্মিত আলামিন কমিউনিটি সেন্টারের দোতলা ভবনও রয়েছে। জেলা প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী, এসব স্থাপনা ধোলাইখালের জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে। তালিকায় আরো রয়েছে অজিত কুমার পালের তিনতলা ভবন, জহিরুলের পাঁচতলা বাড়ি, ইয়াসিন গংয়ের ছয়তলা বাড়ি, সুমান ব্যাপারীর পাঁচতলা বাড়ি, তারা মিয়ার পাঁচ ও ছয়তলা বাড়ি, নাজিম উদ্দিনের দোতলা ভবন, আমির উদ্দিন গংয়ের দোতলা বাড়ি, চান মিয়ার চারতলা ভবন, আরিফ নিবাসের ছয়তলা ভবন এবং আবদুস সাত্তার গংয়ের ছয়তলা ভবন। এভাবে মোট ৯৭ দখলদারের বিস্তারিত তথ্য দেয়া হয়েছে ওই তালিকায়।

ধোলাইখাল দখলের বিষয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলেও দখল উচ্ছেদের কোনো পরিকল্পনা নেই খালটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ডিএসসিসির। এমনকি খালটির সীমানা নির্ধারণেও সংস্থাটির কোনো আগ্রহ নেই। এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আপাতত ধোলাইখাল পুনরুদ্ধার নিয়ে আমাদের কোনো কার্যক্রম নেই। তবে অন্যান্য খাল নিয়ে আমরা কাজ করছি।’

Sutrapur_MAS_250826_006

দখল করা জায়গায় অস্থায়ী বাজার

ধোলাইখাল দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে আলামিন কমিউনিটি সেন্টারের মালিক মো. আনোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সেন্টারটি ২০১৩ সালের দিকে নির্মাণ করা হয়েছে। এর আগে এখানে বসতবাড়ি ছিল। বাড়িটি আমি পৈতৃক সূত্রে পেয়েছি। তবে সেন্টারের কিছু অংশ খালের জায়গায় রয়েছে, এটা অস্বীকার করছি না। সরকার জায়গাটি পুনরুদ্ধার করতে চাইলে দেশের স্বার্থে আমরা বিনাপ্রশ্নে তা ছেড়ে দেব।’ ধোলাইখালের স্মৃতিচারণ করে আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘খালটি আমাদের চোখের সামনেই ভরাট হয়েছে। স্বাধীনতার পরও এটি সচল ছিল। এখানে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা হতো। নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁ ও নরসিংদী থেকে বড় বড় বাণিজ্যিক নৌকা এ পথে যাতায়াত করত।’

সূত্রাপুরের আরেক বাসিন্দা আক্তার হোসেন বলেন, ‘এরশাদ সরকারের আমলে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্পের আওতায় খালটি ভরাট করে বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে এ এলাকার অন্যান্য খাল ও জলাশয়ও ভরাট হতে থাকে।’

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬০৮ সালে ইসলাম খান চিশতীকে বাংলার সুবেদার নিযুক্ত করেন। কৌশলগত ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় তিনি ১৬১০ সালে রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবং যাতায়াত, বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ধোলাইখাল খনন করান। খালটির নামেই এলাকার নাম হয় ধোলাইখাল। প্রায় ৪০০ বছর টিকে থাকা খালটি তিন দশক আগে ভরাট করে বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। এর কুফল এখন স্থানীয় এলাকা ছাড়িয়ে রাজধানীর বড় অংশে দৃশ্যমান।

১৯৮৮ সালের বন্যায় ঢাকার অনেক এলাকা প্লাবিত হওয়ার পর বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের দশকে ঢাকা ওয়াসা ও তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশন বড় খালগুলোর ওপর বক্স কালভার্ট নির্মাণ শুরু করে। তখন যুক্তি দেয়া হয়েছিল, পানিপ্রবাহ অব্যাহত থাকলেই খালের উদ্দেশ্য পূরণ হবে। এ যুক্তিতেই ঢেকে ফেলা খালগুলোর একটি ধোলাইখাল।

বক্স কালভার্ট দিয়ে ধোলাইখাল ঢেকে দেয়ার ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত বিপর্যয় এখন স্পষ্ট। তাই সরকারের নতুন পরিকল্পনাগুলোয় বক্স কালভার্ট উন্মুক্ত করে নগরীর বহুমাত্রিক সমস্যা সমাধানের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ প্রণীত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায়ও (ড্যাপ) বলা হয়েছে, হারিয়ে যাওয়া খাল, প্রাকৃতিক জলাধার ও নৌপথ পুনরুদ্ধার ছাড়া ঢাকাকে সচল রাখার বিকল্প নেই।

ঢাকার জলাবদ্ধতা, আরবান হিট আইল্যান্ড ও যানজটের মতো জটিল সমস্যা সমাধানে বড় খালগুলো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনে নৌপথ পুনরুদ্ধারের পরামর্শ দিয়েছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকার চারপাশে চারটি বড় নদ-নদী এবং শহরের ভেতরে অর্ধশতাধিক খাল রয়েছে। কয়েকটি বড় খালের ওপর বক্স কালভার্ট নির্মাণ করায় জলাবদ্ধতাসহ নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে, নষ্ট হয়েছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। নীতিনির্ধারকরা অনেক দেরিতে বুঝেছেন, খাল শুধু পানিপ্রবাহের মাধ্যম নয়; প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায়ও এটি গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঢাকার বাসযোগ্যতা ফেরাতে সিএস ম্যাপ অনুযায়ী বক্স কালভার্ট সরিয়ে খালগুলো পুনরুদ্ধার করা জরুরি।’

হারিয়ে যাওয়া খাল পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বর্তমান সরকার। ঢাকার খালগুলো খনন ও পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সরকার একটি বড় দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খাল, জলাশয় ও সবুজ পুনরুদ্ধার ছাড়া ক্রমেই বাসযোগ্যতা হারাতে থাকা ঢাকাকে বাঁচানো যাবে না। এক্ষেত্রে ধোলাইখাল পুনরুদ্ধার তুলনামূলক সহজ। এর নিচের বক্স কালভার্ট দুর্বল হয়ে নিজ থেকেই ভেঙে পড়ছে। সরকার এটি উন্মুক্ত করে নৌ-যোগাযোগ চালু করতে পারে।’