যশোরে এক সপ্তাহ ধরে চলছে তীব্র তাপপ্রবাহ। তাপমাত্রা বিরাজ করছে ৪০-৪২ ডিগ্রিতে। শুক্রবার ছিল ৪১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল বেলা ৩টায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র গরমে বিপাকে পড়েছেন মাছের রেণু উৎপাদনকারীরা। খরায় হ্যাচারিতে অক্সিজেন সংকট দেখা দিয়েছে। এতে মারা যাচ্ছে মাছের রেণু।

তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে এ খাতের উদ্যোক্তাদের প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হবে বলে জানান হ্যাচারি মালিকরা। এবার মাছের রেণু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দেড় লাখ কেজি। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়েছে উৎপাদন। গরমের কারণে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও উৎপাদন হবে না বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

মার্চ-আগস্ট পর্যন্ত মাছের রেণু উৎপাদনের ভরা মৌসুম। দেশের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ রেণু যশোর থেকে সরবরাহ করা হয়। চাঁচড়া মৎস্যপল্লীর ৪০টি হ্যাচারিতে গত বছর প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কেজি রেণু উৎপাদন হয়।

যশোর জেলা মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি ফিরোজ খান বলেন, ‘খরার কারণে ক্রেতারা রেণু কিনছেন না। যে কারণে দাম কমে গেছে। বর্তমানে ২ হাজার টাকা কেজিতে বিক্রি করা হচ্ছে পোনা। অথচ গত মৌসুমে দাম ছিল ৪ হাজার টাকা কেজি। যশোরে গত বছর আমরা দেড় লাখ কেজি মাছের রেণু উৎপাদন করেছিলাম। কভিডের কারণে অনেকেই হ্যাচারি বন্ধ রেখেছিলেন। চলতি মৌসুমে পুরোদমে সবাই উৎপাদন শুরু করলেও প্রচণ্ড খরায় তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকে নেমে আসবে উৎপাদন। এতে হ্যাচারি মালিকদের ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হবে। আগে আমরা বিদ্যুৎ বিল দিতাম কৃষি রেটে। এখন দিতে হচ্ছে শিল্প রেটে। আবার বিদ্যুতের পাওয়ার বাড়াতে নোটিস দেয়া হয়েছে। পাওয়ার বাড়ালে প্রতি মাসে অতিরিক্ত খরচ বেড়ে যাবে। এতে উৎপাদন খরচও বাড়বে দ্বিগুণ।

জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, রেণু উৎপাদনে যশোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জেলায় ৪০টি হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে কার্প জাতীয় রেণু উৎপাদন ৬৪ দশমিক ৮৬ টন। জেলায় রেণুর চাহিদা ১৫ দশমিক ২৩ টন। উদ্বৃত্ত ৪৯ দশমিক ৬৩ টন দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। এর মধ্যে তেলাপিয়ার রেণু ১০১ দশমিক ৪০ মিলিয়ন উৎপাদন হচ্ছে। জেলায় এর চাহিদা রয়েছে ৯৮ দশমিক ৮৫ টন। তেলাপিয়ার পোনা উদ্বৃত্ত থাকে ৬ দশমিক ৫৫ টন। পাঙাশের রেণু উৎপাদন ৩ দশমিক ৬২ টন এবং শিং, মাগুর, পাবদা, গুলসার রেণু উৎপাদন দশমিক ৮৫ টন।

যশোরে মোট বাঁওড় রয়েছে ৫১টি। যার আয়তন ১৮ হাজার ৮৪ হেক্টর। মূলত এসব বাঁওড় থেকে মাছ উৎপাদন হচ্ছে। এখানকার উৎপাদিত মাছ দেশের অর্ধেক চাহিদা মিটিয়ে থাকে। যশোরের হ্যাচারিগুলো রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, বিগহেড, থাই সরপুঁটি, মিরর কার্প, জাপানি, চিতল, আইড়, তেলাপিয়া, মনোসেক্স তেলাপিয়া, শিং, কৈ, থাই কৈ, পাঙাশ মাছের পোনা উৎপাদন করে। হ্যাচারির পাশাপাশি যশোরে পাঁচ-ছয় হাজার নার্সারি রয়েছে। জেলার দুই লাখ লোক মাছ উৎপাদন, চাষ এবং সংশ্লিষ্ট পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছে।

রূপালী ফিশ হ্যাচারি দেখভাল করেন মাসুদুল মন্ডল। তিনি বলেন, ‘‌গরমে অক্সিজেন সংকট দেখা দিয়েছে। আমাদের যতগুলো বৈদ্যুতিক মোটর আছে, সব চালিয়েও পানি ঠাণ্ডা করা সম্ভব হচ্ছে না। গরমে মাছের রেণু বাঁচানো সম্ভব না, যা বাঁচবে তাতে খরচ উঠবে না। কয়েক দিনের গরমে আমাদের পরিশ্রমও বাড়াতে হয়েছে।’

রেণু উৎপাদনকারী নয়ন হোসেন জানান, চলতি সপ্তাহে  ১২ কেজি রেণুতে মাত্র ২০ লাখ পোনা হয়েছে, যা স্বাভাবিকভাবে হয়ে থাকে ৩২ লাখ পোনা। যেভাবে গরম পড়ছে এভাবে কয়েক দিন থাকলে প্রায় সব মাছের রেণু মারা যাবে।

জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান গোলদার বলেন, ‘সবসময় আমাদের প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে রেণু উৎপাদন করতে হয়। প্রচণ্ড গরমে ব্যাহত হয় মাছের রেণু উৎপাদন।’

এ বিষয়ে যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সরকার মো. রফিকুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যশোরে গত কয়েকদিন তাপপ্রবাহ বিরাজ করছে। ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। হ্যাচারিগুলোয় রেণু উৎপাদন কমে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়তে পারে দেশের বাজারে।’