নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত ডিপোগুলোয় যথেষ্ট পরিমাণে তেল মজুদ রয়ে গেছে। সীমিত ধারণক্ষমতার কারণে আমদানীকৃত নতুন তেল মজুদ করাও সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় বেসরকারি জ্বালানি পরিশোধন প্রতিষ্ঠানে ট্যাংকার ও ফিলিং স্টেশনে ভাড়ায় তেল মজুদ রাখার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটির তিনটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান (পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা) প্রতিদিন ১৬ হাজার টন ডিজেল বিক্রি করে। কভিড-১৯-এর সংক্রমণ রোধে সারা দেশে এক মাস ধরে চলমান সাধারণ ছুটির কারণে বন্ধ রয়েছে যানবাহন চলাচল। ফলে বর্তমানে গড়ে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ৭ হাজার টন। অর্থাৎ প্রতিদিন ডিজেলের বিক্রি কমেছে ৫৩ শতাংশের বেশি। সব মিলিয়ে বিপিসির জ্বালানি বিক্রি কমেছে ৬০ শতাংশ। এছাড়া জেট ফুয়েল ও ফার্নেস অয়েলের মজুদ সক্ষমতার চেয়েও বেশি খালাস হওয়ায় বিপাকে পড়েছে সংস্থাটি। জেট ফুয়েলের বিক্রি প্রায় শতভাগ কমে যাওয়ায় উদ্বৃত্ত জেট ফুয়েলে জাহাজ থেকে খালাসের পর ফ্লোটিং অবস্থায় রাখা হয়েছে। এদিকে বিশ্ববাজারে দাম কমে যাওয়ার আগেই আমদানীকৃত জ্বালানিবাহী পাঁচটি জাহাজ দেশে এসে খালাসের অপেক্ষায় আছে প্রায় দুই মাস ধরে।
কয়েক মাস আগে রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের সরবরাহজনিত কারণে ডিজেলের মজুদ কমে যায়। সংকট উত্তরণে বিপিসি ডিজেলসহ প্রয়োজনীয় জ্বালানির আমদানি বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু গত এক মাস ধরে দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণজনিত দুর্যোগে চাহিদা কমে যাওয়ায় উল্টো মজুদ সংকটে পড়েছে বিপিসি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের কনডেনসেট পরিশোধনকারী বেসরকারি নয়টি রিফাইনারিসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি।
চিঠিতে বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর ট্যাংকারের মজুদ সক্ষমতার তথ্য ও মাসিক ভিত্তিতে টনপ্রতি জ্বালানি মজুদের ভাড়া দর চাওয়া হয়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই বিপিসির প্রস্তাবে অনীহা দেখালেও ইউনাইটেড পাওয়ার, সুপার রিফাইনারি, মেসার্স ইলিয়াস ব্রাদার্স লিমিটেড, সিনথেটিক রেজিন লিমিটেডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মাসিক ভিত্তিতে ট্যাংকার ভাড়া দিতে সম্মত হয়েছে। বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার জন্য গত সপ্তাহে উদ্বৃত্ত জ্বালানি মজুদের বিষয়ে একটি আপত্কালীন কমিটিও করেছে বিপিসি। পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) আবদুস সোবহানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিপিসির উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন/সংস্থাপন) মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ইনস্টলেশন ম্যানেজার মো. মজিবুর রহমান ও মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ইনস্টলেশন ম্যানেজার মো. হেলাল উদ্দীন।
জানতে চাইলে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন ও পরিকল্পনা) বণিক বার্তাকে বলেন, জ্বালানির চাহিদা অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় বিপিসি নতুন এক সমস্যার মধ্যে পড়েছে। আমাদের ট্যাংকারগুলো পূর্ণ হয়ে আছে। এমতাবস্থায় আরো দুই লাখ টনের ধারণ সক্ষমতার ট্যাংক দরকার। আমরা বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করছি। আলোচনা সাপেক্ষে সবচেয়ে কম দরদাতা প্রতিষ্ঠানের ট্যাংকারে জ্বালানি মজুদের চিন্তাভাবনা হচ্ছে।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে মার্চে দুটি জ্বালানিবাহী জাহাজ এসেছে। এপ্রিলে এসেছে তিনটি জাহাজ। প্রতিটি জাহাজে ৩০ হাজার টন করে প্রায় দেড় লাখ টন জ্বালানি রয়েছে। এর মধ্যে মার্চে আসা জাহাজ দুটি লে-টাইম (চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছানো) অনুযায়ী আসতে পারেনি। ফলে খালাসে বিলম্ব হলেও মার্চের ওই দুটি জাহাজের জন্য জরিমানা দেবে রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এপ্রিলে আসা তিনটি জাহাজ চুক্তির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য নিয়ে আসায় এ তিনটি জাহাজকে খালাসে প্রস্তুত হওয়ার ১০৮ ঘণ্টা পর থেকে দৈনিক (২৪ ঘণ্টায়) প্রায় ১০ লাখ টাকা হারে জরিমানা গুনতে হবে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিপিসিকে। ফলে যেকোনো উপায়ে জ্বালানি খালাস করা না গেলে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকা করে জরিমানা গুনতে হবে বিপিসিকে। এজন্য যেকোনো উপায়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ট্যাংকারে হলেও জ্বালানি মজুদের চেষ্টা করছে সংস্থাটি।
বিপিসির তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটির ডিজেল মজুদ সক্ষমতা রয়েছে ৬ লাখ ৩১ হাজার ৭৯২ টন। এর মধ্যে ২২ এপ্রিলের হিসাবে ডিপোতে মজুদ রয়েছে ৬ লাখ ১২ হাজার ৪৪৯ টন। কেরোসিনের মজুদ সক্ষমতা ৪৩ হাজার ২৫৩ টনের বিপরীতে মজুদ রয়েছে ২৯ হাজার ৩৮৮ টন। পেট্রোলের ধারণক্ষমতা ২ হাজার ১৪৩ টনের বিপরীতে মজুদ রয়েছে ১ হাজার ৯২ টন। বিপিসির অকটেন ধারণক্ষমতা ৩৫ হাজার ৩৪৪ টন, এর বিপরীতে মজুদ রয়েছে ২৫ হাজার ৭৫৬ টন। ফার্নেস অয়েলের ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৪১ হাজার ৩৪০ টন। বর্তমানে মজুদ রয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৫৯৩ টন। জেট ফুয়েলের মজুদ সক্ষমতা ৬৫ হাজার ৮৫৮ টন, বর্তমানে মজুদ রয়েছে ৭০ হাজার ১৬৫ টন।
বিপিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়া এ মুহূর্তে বিপিসির আমদানীকৃত জ্বালানি মজুদের আর কোনো উপায় নেই। এরই মধ্যে ইউনাইটেড পাওয়ার চট্টগ্রামের ৬৪ হাজার টন সক্ষমতার ট্যাংকারের জন্য সবচেয়ে কম মাসিক ২৫০ টাকা (টনপ্রতি) ভাড়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া সুপার রিফাইনারি দিয়েছে টনপ্রতি ৪০০ টাকা, সিনথেটিক রিজেন ৪৫০ টাকা এবং মেসার্স ইলিয়াস ব্রাদার্স ৬৯০ টাকা দর প্রস্তাব করেছে। গঠিত কমিটির পর্যালোচনা শেষে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠাবে। প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে বেসরকারি ট্যাংকারে জ্বালানি মজুদে যাবে বিপিসি।









