তাহফিজ, মাকড়শা, বিস্কুট, পাঁচ পয়সা, কদমফুল, মাছের কাঁটা, দশফুল, আনারস এসবই টুপির ডিজাইনের নাম। বাহারি নামের এ ডিজাইন করা টুপি তৈরি হচ্ছে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার শতাধিক গ্রামে। গ্রামের নারীরা গল্পের তালে তালে তৈরি করছেন এসব টুপি। তাদের কারিগরি নিপুঁণ হাতের ছোঁয়া আর সুতো ও ক্রুশকাটার মিলিত বন্ধনেই তৈরি এসব টুপি চলে যাচ্ছে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে। উপজেলার অর্ধলাখ নারী বাণিজ্যিকভাবে এ টুপি তৈরি করে বাড়তি আয় করছেন। টুপি তৈরি করেই চলছে অনেকের সংসার। তৈরীকৃত টুপি বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন টুপির কারিগররা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় ২০ বছর আগে শেরপুর উপজেলার কল্যাণী গ্রামের নারীরা টুপি  বোনার কাজ শুরু করেন। তখন গ্রাম্যবধূরা বাড়তি আয়ের আশায় সংসারের কাজ শেষে টুপি বুনতেন। বাড়তি আয় শুরু হলে তা দেখে অন্য নারীরাও টুপি বোনা শুরু করেন। এরপর থেকে তা ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। গত ১৫ বছরের ব্যবধানে টুপি তৈরিতে অনেকটা বিপ্লব ঘটে গেছে। বর্তমানে উপজেলার শতাধিক গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে টুপি তৈরির কাজ চলছে। এর মধ্যে উপজেলার জয়লা-জুয়ান, জয়লা-আলাদি, কল্যাণী, চক-কল্যাণী, চকধূলি গুয়াগাছী, বিনোদপুর, মির্জাপুর, খানপুর, খানপুর দহপাড়া, শেরুয়া, শেরুয়া বটতলা, হামছায়াপুর, কাঁঠালতলা, ভিমজানি গ্রাম অন্যতম। বছরের ১১ মাসই এ পেশার সঙ্গে অন্তত অর্ধলাখ মানুষ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকেন। যাদের মধ্যে সিংহভাগই নারী। তবে প্রত্যেক রমজানে চাহিদা বাড়ায় কারিগর সংখ্যা বেড়ে যায়। এসব গ্রামে সুতাসহ টুপি তৈরির সব ধরনের উপকরণ পৌঁছানোর জন্য তিন শতাধিক কর্মী কাজ করেন। টুপি তৈরি শেষ হলে তারা বাড়ি বাড়ি যান এবং সুতার দাম বাদ রেখে পাইকারি বাজারদর অনুযায়ী সে টুপিগুলো ক্রয় করেন।

টুপি তৈরির নারী কারিগররা জানান, এ শিল্পে কোনো টাকা বিনিয়োগ করতে হয় না, যা করার সবই মহাজনের পক্ষ থেকে করা হয়। নারীদের কেবল শ্রম আর হাতের নিপুঁণ ছোঁয়া বিনিয়োগ করতে হয়। সুতা মহাজন দিয়ে থাকে। টুপি তৈরি হলে দাম দিয়ে সুতার দাম কেটে নেয়।

টুপির কারিগর কুলসুম বিবি জানান, তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে টুপি বুনে সংসার চালাচ্ছেন। মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা টুপি বুনে আয় করেন। তিনি ২০ টাকা থেকে ১০০ টাকা দামের মধ্যে টুপি বুনন করেন। সে টুপি বাজারে খুচরা বিক্রি হয় ৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত।

বগুড়া জেলা হস্ত ও কুটির শিল্প উন্নয়ন সমিতির সভাপতি মেসার্স জুয়েল ক্যাপ ডিপোর স্বত্বাধিকারী মো. জুয়েল আকন্দ জানান, বগুড়া সদর উপজেলা, শেরপুর, ধুনট, কাজীপুর, রায়গঞ্জ, সারিয়াকান্দি, শিবগঞ্জ, শাজাহানপুর উপজেলায় বাহারি ডিজাইনের জালি টুপি তৈরি করা হয়। শেরপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি টুপি তৈরি হয়ে থাকে, যা আবার বিভিন্ন নামে পরিচিত। তিনি জানান, করোনার কারণে বিগত দুই বছর ব্যবসায় স্থবিরতা ছিল। তবে সেটি এরই মধ্যে কেটে যেতে শুরু করেছে।