নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে চলমান লকডাউনের কারণে একে একে বন্ধ হতে শুরু করেছে দেশের বৃহৎ ইস্পাত কারখানাগুলো। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ইস্পাত খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম তাদের কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে। মূলত লকডাউনের কারণে কাঁচামাল সংকট, পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া ও উৎপাদিত পণ্যের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে কারখানা চালু রাখা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে দেশের অধিকাংশ ইস্পাত কারখানা বন্ধ হয়ে গেলেও খোলা ছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত পণ্য উৎপাদনকারী বিএসআরএম গ্রুপ। এ সময় গ্রুপটির প্রধান কার্যালয় বন্ধ রাখলেও প্রায় ১২টি বিভিন্ন ধরনের কারখানা ও ওয়্যারহাউজ চালু রাখা হয়। চাহিদা থাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় পণ্য সরবরাহও দেয়া হয়। পণ্য সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে কয়েক দিন আগে প্রশাসনের কাছ থেকে ৪৮টি ডেলিভারি কাভার্ড ভ্যানের জন্য অনুমতিও নিয়ে রাখে তারা। কিন্তু দৈনিক ভিত্তিতে নেয়া শ্রমিক সংকট, বন্দর ও কাস্টমস থেকে আমদানি কাঁচামাল সংগ্রহে বিলম্ব, স্থলবন্দর দিয়ে কাঁচামাল আমদানি বন্ধ থাকা এবং মজুদ কাঁচামালের সংকটে শেষ পর্যন্ত কোম্পানিটিও ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে। তবে কারখানার মেইনটেন্যান্স কার্যক্রম চালু রাখার স্বার্থে এ সময় পর্যন্ত কর্মীদের ‘ওয়ার্ক অ্যাট হোম’ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। 

একইভাবে বৃহস্পতিবার থেকে বন্ধ হয়ে গেছে চট্টগ্রামের গোল্ডেন ইস্পাত। তারও আগে বন্ধ হয়েছে আরেক ইস্পাত জায়ান্ট একেএস ইস্পাত ও জিপিএইচ ইস্পাত (নতুন প্লান্ট)। কাঁচামাল সংকট, পরিবহন ও শ্রমিক সংকটে বন্ধের পথে রয়েছে কেএসআরএম, আরএসআরএম, বায়েজিদ স্টিলসহ অন্য ইস্পাত কারখানাগুলোও। রোলিং মিল সীমিত পরিসরে চালু থাকলেও মেল্টিং কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে কাঁচামাল সংকটে। তবে নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতির উন্নতি হলে স্থগিত থাকা দেশের সব ধরনের নির্মাণকাজ চালু হবে। তখন চাহিদাও বেড়ে যাবে। এ কারণে সীমিত পরিসরে যতটুকু সম্ভব রড উৎপাদন করে মজুদ রাখতে চাইছে কোম্পানিগুলো। 

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জহির চৌধুরী এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানই খোলা রাখা সম্ভব নয়। যদিও সরকারিভাবে ইস্পাত খাতের কারখানাগুলো বন্ধ রাখার বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু কাঁচামাল সংকটের কারণে অনেক কারখানাই খোলা রাখা যাচ্ছে না। পাশাপাশি পণ্য সরবরাহ না থাকায় নগদ অর্থ সংকটে শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বেতনভাতা দিতেও সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। 

জানা গেছে, নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে সরকারি সাধারণ ছুটি বর্ধিত করার পর থেকেই দেশের ছোটখাটো ইস্পাত পণ্য কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব মজুদ দিয়ে কোনো রকমে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছিল। তবে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড থেকে স্ক্র্যাপ সংগ্রহ বন্ধ থাকা ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির যন্ত্রাংশ আমদানি সীমিত হয়ে পড়ায় ধীরে ধীরে উৎপাদন বন্ধের দিকেই ঝুঁকছে কোম্পানিগুলো। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে প্রায় ১৪ লাখ টন স্ক্র্যাপ সরবরাহ পড়ে আছে। তাছাড়া ভারত থেকে আকরিক লোহার আমদানি বন্ধ থাকায় ইস্পাত কোম্পানিগুলোর মেল্ডিং কারখানা কোনোভাবেই চালু রাখা সম্ভব নয়। তবে শুধু বিলেট দিয়ে রড প্রস্তুত করা যায় বলেই রি-রোলিং মিলগুলো চালু রেখেছে কিছু প্রতিষ্ঠান, যা আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন মালিকরা। 

জানতে চাইলে কেএসআরএমের প্রধান নির্বাহী মেহেরুল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, সবকিছুর মতো দেশের ইস্পাত খাতও কঠিন সময় পার করছে। ইস্পাত খাতের বৃহৎ কারখানাগুলোর সিংহভাগ কাঁচামালই আমদানিনির্ভর। বর্তমান পরিস্থিতিতে চীন ছাড়া বিশ্বের অধিকাংশ দেশ থেকেই পণ্য আমদানি প্রায় বন্ধ। সংগত কারণে কারখানা বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায়ও নেই। সীমিত পরিসরে চাহিদা থাকলেও দিন দিন পরিবহন সেবা বন্ধ, অঞ্চলভিত্তিক লকডাউনের কারণে পণ্য সরবরাহ দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এর পরও নভেল করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত হওয়া প্রধান লক্ষ্য হওয়ায় ক্ষতি সত্ত্বেও উৎপাদন আপাতত বন্ধ রাখা ছাড়া উপায়ও নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। 

খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় কয়েকশ ইস্পাত পণ্য উৎপাদনকারী কারখানা রয়েছে। তবে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের অধীন কারখানার সংখ্যা ৩৬। এ প্রতিষ্ঠানগুলো বেশির ভাগই চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত। এসব কারখানা দেশের ইস্পাত পণ্যের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে। এ খাতে কারখানা, পরিবহন, বিপণনসহ কয়েক লাখ মানুষ কাজ করে। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাসজনিত সংকটে অধিকাংশ এলাকায় দৈনিক ভিত্তিতে আসা শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে। তাছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পণ্য সরবরাহের জন্য ব্যবহূত যানবাহনের দীর্ঘ যাত্রায় চালক ও শ্রমিকের খাবারের সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ কারণে কোম্পানিগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ওয়্যারহাউজ, ডিলারদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে পারছে না। যার কারণে চলতি সপ্তাহের মধ্যে দেশের চালু থাকা কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা।