ময়মনসিংহের ত্রিশালে করোনার অনুদান ভেবে অনলাইনে আবেদন করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যয়ন নিতে ভিড় করছেন হাজারো শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। এ সুযোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যয়নপত্র দিতে জনপ্রতি ১০০ টাকা করে নিচ্ছে। অন্যদিকে অনলাইনে আবেদন করতে বিভিন্ন দোকানেও ভিড় জমাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এসব দোকানে আবেদন প্রতি নেয়া হচ্ছে ২০০ টাকা। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা বলছেন, এ অনুদান পাবেন শারীরিক প্রতিবন্ধী, অসুস্থ ও দরিদ্র অসহায় শিক্ষার্থীরা। এ অনুদান সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য নয়।

জানা গেছে, গত বছরের মতো এবারো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুরারোগ্য ব্যাধি ও দুর্ঘটনার শিকার শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের অনুদান দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এ অনুদানকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য করোনার অনুদান বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানো হয়। এরপর থেকেই ত্রিশালের শিক্ষার্থীদের মাঝে অনুদানের আবেদন করতে তোড়জোড় শুরু হয়।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা করোনায় অনুদানের ১০ হাজার টাকা পাওয়ার গুজবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন কম্পিউটারের দোকানে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ত্রিশাল পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন কম্পিউটারের দোকানে আবেদন করতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উপচেপড়া ভিড়। কম্পিউটার দোকানিরা প্রতিটি আবেদনে ২০০ টাকা করে নিচ্ছেন। আবেদনের প্রচুর চাহিদা থাকায় ব্যবসায়ীরা হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। অনুদানের আবেদনের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে প্রত্যয়নপত্র, ফোন নম্বর, বিকাশ নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর ও জন্মসনদ।

ত্রিশাল কেন্দ্রীয় টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজের শিক্ষার্থী লিটন মিয়া জানান, অধ্যক্ষ শরাফত তার কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র দিতে ১০০ টাকা নিয়েছেন। প্রত্যেক শিক্ষার্থীই ১০০ করে টাকা দিয়ে প্রত্যয়নপত্র নিয়েছেন।

একই প্রতিষ্ঠানের তামিম জানান, তিনিও ১০০ টাকা দিয়ে প্রত্যয়ন নিয়েছেন। গরিব বলার পরও ছাড় দেয়া হয়নি। ১০ হাজার করে অনুদান পাবেন শুনে তারা অনলাইনে আবেদন করতে এসেছেন।

কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করে জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যয়নপত্র আনতে টাকা লেগেছে। ক্ষেত্র বিশেষে কোনো কোনো স্কুল ২০০ টাকাও নিচ্ছে বলে অনেকে অভিযোগ করেন।

এদিকে ৪ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক-কর্মচারী ও ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিশেষ অনুদান বিষয়ে কাউকে ফোন দেয়া হয়নি। এনআইডি নম্বর, বিকাশ নম্বর, গোপন পিন নম্বরের মতো কোনো তথ্য চাওয়া হয়নি। প্রতারক চক্র থেকে সতর্ক থাকার জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সবাইকে অনুরোধ করা হয়।

ত্রিশাল মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলিমুল হক তরফদার বলেন, আমি প্রত্যয়ন পত্রের জন্য কোনো টাকা নিচ্ছি না। আমি জেনারেল ও উন্মুক্ত, এ দুই শাখায় প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছি বিনা মূল্যে। প্রত্যয়ন না দিলে এ নিয়ে সমালোচনায় পড়তে হতো।

সরকারি নজরুল কলেজের অধ্যক্ষ হাজী মজিবুর রহমান বলেন, আমি প্রত্যয়ন দিতে খুব ব্যস্ত আছি। আমরা প্রত্যয়ন দিতে কোনো টাকা নিচ্ছি না।

ত্রিশাল মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ঝিল্লুর রহমান আনম জানান, এটা করোনার অনুদান নয়। এ ধরনের অনুদান গত বছরও দেয়া হয়েছে। দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনার শিকার শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন। দুস্থ, প্রতিবন্ধী, গরিব ও অনগ্রসর ছাত্রছাত্রীরা অগ্রাধিকার পাবেন। ৭ মার্চ আবেদনের শেষ সময়। তবে এটি করোনা প্রণোদনা বা স্টুডেন্ট ভাতা নয়।

ভালুকা ত্রিশাল মৈত্রী ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সেলিমুল হক তরফদার বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের অবগত করেছি, এটি করোনার অনুদান নয়। এর পরও প্রত্যয়ন দিতে হয়েছে। প্রত্যয়নের জন্য আমরা কোনো টাকা নিইনি। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন। সবাই এ অনুদান পাবেন না।

ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এভাবে না জেনে ও না বুঝে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ছোটাছুটি কাম্য নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও কোনো কিছু নিশ্চিত না হয়ে ভুল তথ্য শেয়ার করা ঠিক না। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি প্রত্যয়নপত্রে টাকা নেয়ার চেষ্টা করে থাকে, তবে খোঁজ নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।