বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) জুলাই ২০২৬ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ, যা গত এপ্রিলে দেয়া পূর্বাভাসের তুলনায় কম। এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থাটি।

প্রতিবেদনটি আজ প্রকাশ হয়েছে। এতে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে নিম্নমুখী সংশোধনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে রফতানি খাতের দুর্বল পারফরম্যান্স, বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি, উচ্চ জ্বালানি মূল্য, অব্যাহত মূল্যস্ফীতির চাপ এবং আরো প্রতিকূল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে থাকবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে, যা এপ্রিলের পূর্বাভাসের সঙ্গে অপরিবর্তিত। সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রলিয়াম, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রভাব পরিবহন, ইউটিলিটি সেবা এবং অন্যান্য ভোক্তা পণ্যের দামে অব্যাহতভাবে প্রতিফলিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে নামতে পারে, তবে এটি এপ্রিলে দেয়া ৮ দশমিক ৫ শতাংশের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি। কারণ জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির দ্বিতীয় দফার প্রভাব, বিনিময় হার পরিবর্তনের প্রভাব এবং খাদ্য ও সেবা খাতে স্থায়ী মূল্যস্ফীতি মূল্যস্ফীতি কমার গতি ধীর করে দিতে পারে।

ADB

এডিও জুলাই ২০২৬-এর হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ, সেবা খাতের স্থিতিশীল কার্যক্রম এবং সামগ্রিকভাবে সংযত সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক পরিবেশের মধ্যেও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ-সহায়তা প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করবে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং বেসরকারি ভোগব্যয়কে সীমিত করছে। রফতানি খাতের দুর্বল পারফরম্যান্স এবং আমদানির মাঝারি প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক চাহিদার দুর্বলতা ও বেসরকারি বিনিয়োগের মন্থরতার ইঙ্গিত দেয়।

সরবরাহের দিক থেকে রফতানিনির্ভর উৎপাদন খাত উচ্চ জ্বালানি মূল্য, দুর্বল বৈদেশিক চাহিদা এবং কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে চাপের মধ্যে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে সার সংকটের ঝুঁকির মুখে রয়েছে কৃষি খাত। তবে রেমিট্যান্সনির্ভর পারিবারিক আয়ের সহায়তায় সেবা খাত প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে।

এডিবির বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আকিরা মাতসুনাগা বলেন, ‘কঠিন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সেবা খাতের স্থিতিশীল কার্যক্রমের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছে। তবে অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, আর্থিক খাতে সুশাসন জোরদার এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে ধারাবাহিক সংস্কার প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব সংস্কার বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতির সহনশীলতা জোরদারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির কিছুটা হ্রাস, ব্যবসা পরিচালনার বিধিবিধান সহজীকরণ, সুশাসনের উন্নতি, কর প্রশাসনে সংস্কার এবং রেমিট্যান্সে প্রণোদনা অব্যাহত থাকায় ভোগব্যয় ও বিনিয়োগ শক্তিশালী হতে পারে। তবে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ঘাটতির কারণে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের গতি ধীরই থাকবে, জোরালো হবে না।

প্রতিবেদনটি সতর্ক করে বলেছে, এখানো উল্লেখযোগ্যভাবে রয়ে গেছে অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের নিম্নমুখী ঝুঁকি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরো তীব্র হলে জ্বালানি ও নৌপরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, বৈদেশিক চাপ আরো বাড়তে পারে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রবৃদ্ধি দুর্বল হতে পারে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহও কমে আসতে পারে।

আরো বলা হয়েছে, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরো বাড়লে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং জ্বালানি-সংক্রান্ত ভর্তুকির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ওপর আর্থিক চাপও বাড়বে। এর পাশাপাশি উচ্চ শুল্ক, বিস্তৃত বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ বা প্রধান অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি আরো দুর্বল হলে রফতানি চাহিদা আরো কমে যেতে পারে এবং উৎপাদন খাতের দুর্বলতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এছাড়া বিনিময় হারের ওপর অব্যাহত চাপ, বৈদেশিক অর্থায়নের সীমিত সুযোগ এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকিও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।