মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী শিক্ষা কমিশন ও টাস্কফোর্স গঠনসহ একগুচ্ছ সুপারিশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত কনসালটেশন কমিটি। মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠিত এ কমিটি গতকাল সরকারের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। এতে মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য আশু, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ করা হয়।

কনসালটেশন কমিটির অন্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে সেপ্টেম্বর থেকে জুন শিক্ষাবর্ষ নির্ধারণ, দশম শ্রেণী পর্যন্ত অবিভাজিত শিক্ষাক্রম করা, অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি পরীক্ষা বাদ রাখা, শিক্ষকদের নিয়োগ-পদোন্নতির জন্য শিক্ষা সার্ভিস কমিশন গঠন, জাতীয় শিক্ষাসেবা বাহিনী চালু করা এবং সংবিধানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া।

কনসালটেশন কমিটি দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪৪টি কর্মশালা ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। এছাড়া অষ্টম ও নবম শ্রেণী সমাপ্ত করা ৪৩৭ জন শিক্ষার্থীর বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত পরীক্ষাও নেয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে গতকাল প্রতিবেদন দাখিল উপলক্ষে আয়োজিত সভায় উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার। সভাপতিত্ব করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন।

গত অক্টোবরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদকে প্রধান করে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিখন-শেখানো কার্যক্রমের উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কনসালটেশন কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহেদা ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ, সাংবাদিক মো. মুসা মিয়া, শেরেবাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুর রহমান এবং আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক একেএম মোস্তফা কামাল। কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি মাধ্যমিক অধিশাখার যুগ্ম সচিব তরফদার মো. আক্তার জামীল।

কনসালটেশন কমিটির খসড়ায় সংবিধানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পৃথক শিক্ষা অধিকার আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিদ্যালয় শিক্ষাকে আদালতে বলবৎযোগ্য অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া দশম শ্রেণী পর্যন্ত অবিভাজিত শিক্ষাক্রমের সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, নবম শ্রেণী থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষাকে বিভিন্ন ধারায় (বিজ্ঞান-মানবিক-ব্যবসায় শিক্ষা) বিভাজিত করার সিদ্ধান্ত সুবিবেচিত হয়নি। এ বিভাজন একাদশ শ্রেণী থেকে হওয়া বাঞ্ছনীয়। এছাড়া পাবলিক পরীক্ষা মূল দক্ষতার বিষয়গুলো বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সমাজপাঠ ও বিজ্ঞানে সীমিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন হবে পাঠ্যবিষয় ও পাঠ্যপুস্তক। প্রতিবেদনে বলা হয়, অষ্টম শ্রেণীতে পাবলিক পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্ত বহাল থাকা উচিত এবং জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা পুনঃপ্রবর্তনের প্রয়োজন নেই।

এছাড়া সুপারিশে বলা হয়, বিদ্যালয়ের শিক্ষায় সময়ের যথার্থ ব্যবহারের জন্য বার্ষিক শিক্ষাপঞ্জি পুনর্বিবেচিত হওয়া দরকার। বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে সংগতি রেখে সেপ্টেম্বর থেকে জুন বা কাছাকাছি সময়ে শিক্ষাবর্ষ নির্ধারণ করা যেতে পারে এবং প্রধানত জুলাই-আগস্টে বার্ষিক গ্রীষ্মের ছুটি হতে পারে। সামগ্রিক বিদ্যালয় শিক্ষার উন্নয়নে সব উন্নয়ন কার্যক্রমকে সুসংহত করে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বিদ্যালয় শিক্ষাকে সর্বজনীন করার কথা বলা হয়।

বেসরকারি বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির গঠন ও দায়িত্বের পরিধি উভয় ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়। সুপারিশ অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কোনো সংসদ সদস্য বা স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি হতে পারবেন না। পাশাপাশি কমিটির প্রধান হতে হলে স্নাতক ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্থায়ী শিক্ষা কমিশন ও মাধ্যমিক শিক্ষা টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ করে বলা হয়, মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়নের জন্য প্রস্তাবিত মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়ন টাস্কফোর্স স্থায়ী সত্তায় পরিণত হবে। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত সাপেক্ষে সামগ্রিক শিক্ষা উন্নয়নের পর্যালোচনা ও দিকনির্দেশনার জন্য স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠিত হলে মাধ্যমিক শিক্ষা টাস্কফোর্স বিদ্যালয় শিক্ষা উপখাত-সম্পৃক্ত বিষয়ে কমিশনের অঙ্গ হিসেবে কাজ করবে (২০২০ সালের খসড়া শিক্ষা খাত পরিকল্পনায় এ রকম সুপারিশ করা হয়েছে)।

প্রতিবেদনে আকর্ষণীয় বেতন, ভাতা, মর্যাদা ও পেশাগত উত্তরণের পথসহ একটি জাতীয় শিক্ষাসেবা বাহিনী (ন্যাশনাল টিচিং সার্ভিস কোর) চালু করারও সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন ডিগ্রি কোর্স থেকে উত্তীর্ণরা শিক্ষা সেবাবাহিনীতে যোগ দিয়ে অন্তত পাঁচ বছর সরকার নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকবে। এছাড়া শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতির জন্য শিক্ষা সার্ভিস কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।

কমিটির আহ্বায়ক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, ‘মাধ্যমিক শিক্ষা কেবল পাঠ্যজ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র নয়, এটি কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সংবেদনশীল সময়। তাই এ স্তরে বৈষম্য নিরসন ও শিক্ষার মানোন্নয়ন অপরিহার্য। গত ৫৫ বছরে শিক্ষা খাত চরম রাজনৈতিক অবহেলার শিকার হয়েছে। জিডিপির ২ শতাংশের কম বাজেট বরাদ্দই এর বড় প্রমাণ। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর অর্ধেক শিক্ষার্থী ঠিকমতো পড়তে বা লিখতে পারছে না, যা একটি জাতির জন্য অশনিসংকেত।’

নির্বাচিত সরকারের কাছে নিজের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘কেবল আশ্বাস নয়, বরং শিক্ষার প্রতি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকতে হবে, যাতে বাজেট বরাদ্দ ও নীতি নির্ধারণে আমূল পরিবর্তন আসে। শিক্ষা সংস্কারের জন্য কেবল চমৎকার রিপোর্ট বা সুপারিশই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত প্রশাসন এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ। নির্বাচনের পর যে সরকারই আসুক না কেন, তাদের এ সুপারিশগুলো নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার আহ্বান জানাই। পাশাপাশি শিক্ষা খাত নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নেয়া হবে সেই প্রত্যাশা করছি।’

শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরার বলেন, ‘প্রশাসনিক কাজের চাপের মধ্যেও কমিটি শিক্ষা খাতের মূল সমস্যাগুলোকে গভীরভাবে অনুধাবন করে গ্রাসরুট পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরে অংশীজনদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরি করেছে।’ শিক্ষক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের যেসব বিষয় আলোচনায় এসেছে, সেগুলো বাস্তব ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সি আর আবরার বলেন, ‘আলোচনার ভিত্তিতে এ নথি আরো সমৃদ্ধ ও পরিমার্জিত করা হবে এবং অংশীজনদের কাছ থেকে চূড়ান্ত গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর এটি অনলাইনে প্রকাশ করা হবে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সংশ্লিষ্টরা যাতে মতামত ও প্রস্তাব দিতে পারেন, সে ব্যবস্থাও রাখা হবে। ভবিষ্যতে সরকার ও নীতিনির্ধারকরা এ রূপরেখার আলোকে একটি শক্তিশালী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলবেন বলে আশা করছি।’

শিক্ষা উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘শিক্ষা খাত কেবল একটি সেকেন্ডারি সেক্টর নয়, বরং জাতি গঠনের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু চাকরির উপযোগী করে গড়ে তোলাই নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা, সহনশীলতা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং একটি উদার দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে টিকে থাকতে মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নেই।’