শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনী কার্যক্রমের পুরনো রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছেন; ফলে নির্বাচনে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, আন্তঃদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। গতকাল দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ‘গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির এমন পর্যবেক্ষণ উঠে আসে।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থ, ধর্ম, পেশি, পুরুষতন্ত্র ও গরিষ্ঠতন্ত্র বাংলাদেশে মৌলিক রাজনৈতিক পুঁজি বলে মন্তব্য করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
সংবাদ সম্মেলনে গণভোটের প্রচারণা সম্পর্কে ১১টি ও প্রাক-নির্বাচনী সার্বিক পর্যবেক্ষণে সাতটি বিষয় তুলে ধরা হয়। টিআইবির এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন তুলে ধরেন সংস্থার জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল হক।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বর্তমান সরকারের সময়েও দুর্নীতি অব্যাহত আছে। এই সরকারে দুদকের সংস্কারের সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করা ভবিষ্যতের জন্য খারাপ উদাহরণ হয়ে থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকার স্বচ্ছতার পরিচয় দিতে পারেনি।’
টিআইবির প্রাক-নির্বাচনী সার্বিক পর্যবেক্ষণে সাতটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হলো—শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনী কার্যক্রমের পুরনো রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছেন; ফলে নির্বাচনে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, আন্তঃদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে; নির্বাচনী সহিংসতার পাশাপাশি পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির ঘোষিত নির্বাচনবিরোধী তৎপরতার ফলে অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি রয়েছে; আগের রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম, পেশি, পুরুষতান্ত্রিক ও গরিষ্ঠতান্ত্রিক শক্তির ব্যবহার শুধু অব্যাহতই রাখেননি, বরং বিশেষ করে অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে; এছাড়া অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য অংশীজনের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি দৃশ্যমান হচ্ছে; বিশেষ করে রাজনৈতিক সংঘাত এবং নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন, অনিয়ম ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রতিরোধে কমিশনের ওপর আরোপিত ক্ষমতার কার্যকর প্রয়োগ দৃশ্যমান নয়; অনলাইন-অফলাইন প্রচারণাসহ নির্বাচনের প্রায় প্রতিটি স্তরে দল ও প্রার্থীরা আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘনসহ বিবিধ অনিয়ম করলেও কমিশন তার অনেকটা অপারগতার কারণে এড়িয়ে যাচ্ছে বা অগ্রাহ্য করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে; এটি নির্বাচনে সব দল ও প্রার্থীর প্রতিযোগিতার সমান ক্ষেত্র এবং সব শ্রেণীর ভোটারদের জন্য অপরিহার্য সুস্থ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিতে ব্যাপক ঘাটতির ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
টিআইবি বলছে—নির্বাচন আয়োজনে সম্পৃক্ত সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে, বিশেষ করে প্রশাসনিক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের একাংশের মধ্যে সুস্থ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে ব্যর্থতা, অনিয়ম ও নিষ্ক্রিয়তা লক্ষণীয়। নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনকে অসহযোগিতার মনোভাবও প্রকাশ পেয়েছে। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অনেকের ক্ষেত্রে সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিতের মূল্যবোধের পরিপন্থী আচরণ ক্রমাগত দৃশ্যমান হচ্ছে।
গণভোটের প্রচারণা সম্পর্কে টিআইবির পর্যবেক্ষণে ১১টি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম—প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে গণভোট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের দোদুল্যমানতা ও উভয় পক্ষের সন্তুষ্টিপ্রত্যাশী অধ্যাদেশ প্রণয়ন, যা শুরুতেই গণভোটের বিষয় ও প্রশ্ন নিয়ে ধোঁয়াশা, বিভ্রান্তি ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে; একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট এবং সংসদে উচ্চকক্ষবিষয়ক বাধ্যবাধকতার সিদ্ধান্ত যদি ওই সন্তুষ্টি অর্জনের উপায় বিবেচনা করা হয়েও থাকে, তবু বিষয়টি আরো জটিল হয়েছে; অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও গণভোট এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারি সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে কোনো ধরনের গঠনমূলক পরামর্শ বা সমন্বয়ের সুযোগ নেয়া হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি; নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় নির্বাচন ও গণভোট সমার্থক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যা প্রশ্নবিদ্ধ।
টিআইবির আউটরিচ ও কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন। সংস্থার উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) সুমাইয়া খায়ের, জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল হক ও গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান এ সময় উপস্থিত ছিলেন।










