যশোরের বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বন্ধ হচ্ছে না স্বর্ণ চোরাচালান। গত এক দশকে প্রায় দেড় হাজার কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে সীমান্তবর্তী এ জেলা থেকে। এর মধ্যে গত চার বছরেই জব্দ করা হয়েছে ২৫০ কেজি। এছাড়া ২০২০ সালে ৪১ কেজি ৭২২ গ্রাম, ২০২১ সালে ১৩ কেজি ১৪৩ গ্রাম, ২০২২ সালে ১৫০ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। চলতি বছরের ছয় মাস না যেতেই ৩৪ কেজির বেশি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে।

তবে স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও মূল হোতারা সব সময় থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত এক দশকে স্বর্ণ জব্দের ঘটনায় অন্তত ৬০টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার প্রায় অর্ধেকের বেশি বিচারাধীন এবং বিচার এক যুগের বেশি সময় ধরে চলছে। আবার বেশির ভাগ আসামি জামিনে রয়েছে। মামলায় যাদের সাজা হয়েছে প্রত্যেকেই স্বর্ণ বহনকারী। এসব মামলার তদন্তেও তেমন অগ্রগতি নেই।

যশোরের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এম ইদ্রীস আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বর্ণ চোরাচালানসহ সব পুরনো মামলার কাজ শেষ করার উদ্যোগ নিয়েছে বিচার বিভাগ। দ্রুতই স্বর্ণ চোরাচালান মামলার কাজ শেষ করা হবে। সাক্ষীর অভাবে এসব মামলার কাজ শেষ করতে বিলম্ব হচ্ছে। অনেক সময় তদন্ত কর্মকর্তারা রিপোর্ট জমা দিতে দেরি করেন। এ কারণেও বিচারে ধীরগতি রয়েছে।’

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, যশোর অঞ্চলে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বড় স্বর্ণের চালান আটক হয় ২০১৮ সালের ৯ আগস্ট। শার্শার শিকারপুর বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা রাত ১০টার দিকে মহিউদ্দিন নামে একজনকে আটক করেন। তার কাছে থাকা একটি ব্যাগ থেকে ৬২৪টি স্বর্ণবার উদ্ধার হয়। যার ওজন ৭২ কেজি ৪৫০ গ্রাম। মামলাটি তদন্ত করে সিআইডি চার্জশিট দেয়। চার্জশিটে মহিউদ্দিনসহ নয়জনের নাম আসে। মামলাটি প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সিনিয়র স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। মহিউদ্দিনসহ চার আসামি জামিনে থাকলেও বাকি পাঁচ আসামি এখনো পলাতক রয়েছে।

যশোর সীমান্ত এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে গরু ব্যবসার নামে খাটাল (গোয়াল) তৈরি করা হয়। মূলত এর আড়ালে বাহকের মাধ্যমে ভারতে স্বর্ণ পাচার করা হচ্ছে। এর বিনিময়ে ভারত থেকে সমপরিমাণ ডলার বা অন্য মুদ্রা অবৈধভাবে বাংলাদেশে আনা হয়। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মানি লন্ডারিং ইউনিটের তদন্তে উঠে আসে, সীমান্তের ওপারে স্বর্ণ চোরাচালানে অংশীদার গৌতম নামে এক ব্যক্তি। এছাড়া সেখানকার আরেক বড় কারবারির নাম নিতাই।

যশোর গোয়েন্দা বিভাগের (সিআইডি) পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কঠোর নিয়ম মেনে ভারত স্বর্ণ আমদানি করে। তাই অনেক সময় চোরাকারবারিরা অবৈধ পথ বেছে নেয়। বিভিন্ন সাংকেতিক কোড ব্যবহারের মাধ্যমে সীমান্ত হয়ে চালান বাইরে যায়। যারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আসছে, তাদের ধরা হচ্ছে। অনেকের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলাও হচ্ছে। বাহকরা অধিকাংশ সময় স্বর্ণের প্রকৃত মালিকের নাম প্রকাশ করতে চায় না। তাদের অসহযোগিতার কারণে এক-দুই স্তরের বেশি পর্যন্ত আমরা যেতে পারি না। দুবাই ও সিঙ্গাপুরে যারা থাকে, তাদের নাম-পরিচয় শনাক্ত করা কষ্টসাধ্য।’

এদিকে স্বর্ণ চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে যশোর সীমান্ত। স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিজিবি বা কাস্টমসের হাতে যে স্বর্ণ উদ্ধার হয় তার ২০ গুণ স্বর্ণ পাচার হয়। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, সীমান্তে একের পর এক স্বর্ণ উদ্ধার ও জব্দের ঘটনা ঘটছে। কখনো গাড়িতে বিশেষ কায়দায়, কখনো পেটের ভেতর বা পায়ুপথে, নারীদের গোপনাঙ্গে, স্যান্ডেল-জুতার ভেতরে বিভিন্ন কায়দায় স্বর্ণ পাচার করা হচ্ছে। বিজিবি ও যশোরের কয়েকটি থানার দেয়া তথ্যমতে, খুলনা বিভাগের ছয় জেলার মধ্যে সীমান্ত এলাকা রয়েছে মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর ও সাতক্ষীরায়। এসব সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণ পাচার হচ্ছে।

৪৯ বিজিবি যশোর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আহমেদ হাসান জামিল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চোরাচালান রোধে বিজিবি সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে আমাদের গোয়েন্দা দল কাজ করছে। স্বর্ণ চোরাচালানে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের ছাড় দেয়া হবে না। বিজিবি অভিযান চালিয়ে স্বর্ণ জব্দ করে এবং আসামির বিরুদ্ধে মামলা দেয়। এরপর এসব মামলার তদন্তভার পুলিশের ওপর বর্তায়। নেপথ্যে থাকা চোরাকারবারিদের সামনে আনবে তদন্তকারী ইউনিট। এর পরও বিজিবি সজাগ ও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।’

তবে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) বেলাল হোসাইন বলেন, ‘স্বর্ণ চোরাকারবারিদের রিমান্ড চেয়ে চালান দেয়া হয়। রিমান্ডে বহনকারীরা মুখ না খোলায় এবং পর্যাপ্ত তথ্য না দেয়ায় আড়ালে থাকা ব্যক্তিরা পার পেয়ে যায়। এছাড়া তথ্য পেলেও পর্যাপ্ত প্রমাণ ও সাক্ষীর অভাবে বের হয়ে যায় অপরাধীরা।’