রাঙ্গামাটির ১০ উপজেলার তিনটিই হ্রদবেষ্টিত। আর ছয়টি উপজেলার সঙ্গে রয়েছে নৌপথ। জেলা শহর থেকে উপজেলাগুলোয় কৃষিপণ্য, অন্যান্য পণ্য এবং যাত্রী পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ কাপ্তাই হ্রদ। শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই হ্রদে নাব্য সংকট দেখা দিয়েছে। এতে নৌপথ বন্ধের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে রাঙ্গামাটি-মারিশ্যা নৌপথে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি হ্রদের আশপাশের এলাকায় ব্যবহার্য পানির সংকট দেখা দিতে পারে।
কাপ্তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হ্রদে পানি রয়েছে ৮১ দশমিক ৮৯ মিনস সি লেভেল (এমএসএল)। তবে মিটার স্কেল অনুযায়ী স্বাভাবিক পানির পরিমাণ থাকার কথা ৯০ দশমিক ৭৬ এমএসএল। কন্ট্রোল রুমের হিসাবে প্রায় ৯ এমএসএল পানি কম রয়েছে ৭২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের হ্রদটিতে।
নৌ-পথের যাত্রীরা বলছেন, রাঙ্গামাটির লংগদু, বাঘাইছড়ি উপজেলার মানুষ নৌপথ এড়িয়ে বিকল্প পথে জেলা শহরে আসতে চাইলে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা হয়ে আসতে হয়। অন্যদিকে সড়ক পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল হওয়ায় নানিয়ারচরের মানুষ সড়ক পথে যাতায়াত করলেও কৃষি পণ্যসহ অন্য মালপত্র পরিবহন করা হয় নৌপথেই। জেলার জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি ও বরকল উপজেলার বাসিন্দাদের নৌপথ ছাড়া বিকল্প না থাকায় তাদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের পানি কমে যাওয়ার কারণে ওইসব এলাকার মানুষকে ব্যবহার্য পানির সংকটেও পড়তে হয়।
বিমল চাকমা নামে বরকল উপজেলার এক কৃষক জানান, এখন তো হ্রদের পানি অনেক নিচে নেমে গেছে। দীর্ঘ সময় ভার বহন করে এনে বোটে তুলতে হয়। আগে তো বোট একেবারে কাছাকাছি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যেত। গৃহস্থালিকাজে ব্যবহারযোগ্য পানি সরবরাহেও দুর্ভোগ বেড়েছে। ব্যবহারের পানি অনেক নিচু থেকে কলসি বা ড্রাম দিয়ে ওপরে তুলতে হয়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থা রাঙ্গামাটি জোনের চেয়ারম্যান মো. মঈনুদ্দিন সেলিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুম এলে কাপ্তাই হ্রদে নৌযান চলাচল ব্যাহত হয়। এটি দীর্ঘদিন ধরেই ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই নৌপথ খননের দাবি জানিয়ে এলেও কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। হ্রদের নৌপথে পলি জমতে জমতে সংকট আরো প্রকট হচ্ছে। রাঙ্গামাটি-মারিশ্যা নৌপথে লঞ্চ চলাচল সম্প্রতি বন্ধ হয়ে গেছে। লংগদুর মাইনীমুখ বাজারের পর আর এ রুটে লঞ্চ নিয়ে এগুনো যাচ্ছে না। সপ্তাহখানেক পর থেকে লংগদুর মাইনীবাজার পর্যন্তও যাওয়া সম্ভব হবে না।’
ষাটের দশকে প্রমত্তা কর্ণফুলী নদীর কাপ্তাই উপজেলার অংশে বাঁধ দেয়ার ফলে সৃষ্টি হয় কাপ্তাই হ্রদ। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে নদীতে বাঁধ দিলে রাঙ্গামাটির আট উপজেলা ও খাগড়াছড়ির দুই উপজেলা বিস্তীর্ণ অংশ পানিতে ডুবে যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে হ্রদের সৃষ্টি হলেও বর্তমানে মৎস্য উৎপাদন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে হ্রদ। হ্রদটি পরিচালনায় রয়েছে একটি কমিটিও। হ্রদের পানি পরিমাপ করে থাকে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
জানতে চাইলে রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক এবং কাপ্তাই হ্রদ ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদে নাব্য সংকটের কারণে নৌপথের যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল ব্যাহত ও দুর্ভোগের বিষয়টি জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও আমি উত্থাপন করেছি। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড রাঙ্গামাটির নির্বাহী প্রকৌশলীকেও এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার জন্য বলা হয়েছে। বিশেষ করে যেখানে লঞ্চ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে; সেসব স্থানে খননের উদ্যোগ নেয়ার জন্য।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড রাঙ্গামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নৌপথ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা একটি প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। আশা করি, আগামী অর্থবছরে একনেক সভায় প্রকল্পটি পাস হবে। প্রকল্পটি পাস হলে জুরাছড়ি, বাঘাইছড়ি, লংগদু নৌ-রুটসহ অন্যান্য নৌপথে ৬৫ কিলোমিটার খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে লংগদুর মাইনিমুখ বাজার থেকে বাঘাইছড়ির মারিশ্যা বাজার পর্যন্ত ৪৬ কিলোমিটার নৌপথ খনন করা হবে।’
জরুরি কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে কিনা এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তয়ন ত্রিপুরা বলেন, ‘সমতল জেলাগুলোয় জরুরি ভিত্তিতে কিছু উদ্যোগ নেয়া গেলেও রাঙ্গামাটি জেলার ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে চাইলে ড্রেজিং মেশিন নামানো যায় না। দীর্ঘমেয়াদি কাজ হলে তখন ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করা যায়।’










