ঝালকাঠি-রাজাপুর আঞ্চলিক সড়কে যান চলাচল ঝুঁকিমুক্ত করার নামে শতবর্ষী রেইনট্রি গাছসহ ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির ৬৬৪টি গাছ কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। সদর উপজেলার গাবখান সেতু থেকে রাজাপুরের মেডিকেল মোড় পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশে এ গাছ কাটার মহাযজ্ঞ চলছে। ঠিকাদারের বিরুদ্ধে সড়কের পাশঘেঁষে মাটি খুঁড়ে গাছের শিকড়ও উপড়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে মূল সড়ক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
ঝালকাঠি-রাজাপুর আঞ্চলিক সড়কের দুই পাশের প্রাচীন গাছগুলো ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে স্থানীয় অধিবাসীদের বসতভিটা রক্ষা করে আসছে। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, এ গাছগুলোর মধ্যে কিছু গাছ বৃটিশ শাসন আমলে তাদের পূর্বপুরুষরা লাগিয়েছেন। কিছু সওজ কর্তৃপক্ষ লাগিয়েছে। আবার স্বাধীনতার আগে ও পরে বিভিন্ন সময় স্থানীয় ব্যক্তিরা অধিকাংশ গাছ রোপণ করে। তাদের অভিযোগ, শ্রমিকরা সড়কের ছোট-বড় সব গাছ সাবাড় করে দিচ্ছে। এতে পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়বে।
তবে কিছু শতবর্ষী গাছের ডালপালা সড়কের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ঝুলে থাকার কারণে মাঝেমধ্যে ছোটখাটো কিছু দুর্ঘটনা ঘটে। ২০২০ সালের ২০ জুলাই বলাইবাড়ি নামক স্থানে সড়কে ঝুঁকে পড়া একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে একটি গাড়ির ছাদ উড়ে যায়। এতে ১৬ জন যাত্রী আহত হন। এরপর থেকেই সড়ক ও জনপদ বিভাগ এ আঞ্চলিক সড়কের ঝুঁকিপূর্ণসহ ভালো গাছগুলোও কাটার জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন সভায় প্রস্তাব করে আসছে।
ঝালকাঠি সড়ক ও জনপদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পাঁচ মাস আগে ঢাকার মিরপুরের পাইকপাড়ায় অবস্থিত প্রধান বৃক্ষপালনবিদের (সওজ) কার্যালয়ে দরপত্রের মাধ্যমে ঝালকাঠি-রাজাপুর আঞ্চলিক সড়কের প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশে ৬৬৪টি গাছ ৭১ লাখ ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। গড়ে প্রতিটি গাছের দাম পড়ে ১০ হাজার ৭০০ টাকা। আলাদা লটে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গাছগুলো ক্রয় করে। সম্প্রতি গাছগুলো কাটা শুরু করে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, ডিপ টিম্বার ট্রেডার্স, রাব্বি এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স টিএন্ডটি এন্টারপ্রাইজ, কাজী এন্টারপ্রাইজ ও মুরাদ এন্টারপ্রাইজ।
সরেজমিনে রাজাপুর পিংরী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকরা একটি প্রাচীন রেইনট্রি গাছ কেটে একাধিক খণ্ডে ভাগ করেছেন। গাছের গোড়ার শিকড়ের অংশ মাটি খুঁড়ে বের করছেন শ্রমিকরা। পাশের কিছু গাছ এমনভাবে শিকড়সহ কেটে মাটি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে দেখে বোঝার উপায় নেই সেখানে কোনো গাছ ছিল।
পিংরী গ্রামের বাসিন্দা আবদুল মজিদ মিয়া বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষদের লাগানো গাছের কোনো ডালপালা কাটলেও পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যেত। সেখানে সড়কের দুই পাশের গাছ কেটে সাবাড় করা হলেও পরিবেশবাদীরা চুপ। গাছগুলো কাটার কারণে পাখি নীড় হারাবে। পথিক ছায়া থেকে বিঞ্চত হবে।
অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক ও রাজাপুর উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মো. শাজাহান মোল্লা বলেন, সড়কের দুই পাশের গাছগুলো ছিল এ উপজেলার মানুষের সবুজ বেষ্টনী। সিডরসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ গাছগুলো আমাদের রক্ষা করেছে। নির্বিচারে গাছ কেটে সড়ক ও জনপথ বিভাগ পরিবেশের ভারসম্য নষ্ট করছে। তাদের এমন সিদ্ধান্তে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডিপ টিম্বার ট্রেডার্সের মালিক শান্ত কুমার বাড়ৈ বলেন, দরপত্রের নির্দেশনা অনুসারে আমরা গাছ কেটে নিচ্ছি। এতে সড়কের কোনো ক্ষতি হবে না। গাছগুলো কাটার ফলে অনেক যানবাহন দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পাবে।
ঝালকাঠি সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ নাবিল হোসেন বলেন, সড়কের দুই পাশের ঝুঁকিপূর্ণ গাছগুলো কাটার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ চালক ও বাসমালিকদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। সড়কের বিভিন্ন বাঁকে গাছের কারণে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটত। সব পরিষ্কার হলে সড়কের দুই ধারে আবার পরিকল্পিতভাবে আকাশমণিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হবে।









