শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে সরকার ২০১৮ সালের জুলাইয়ে বিজ্ঞানশিক্ষা সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নেয়। ২০২২ সালের জুনে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৫১১ কোটি ৫১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় এর বাজেট বাড়িয়ে ২ হাজার ৫৫০ কোটি ১৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। নতুন সময়সীমা অনুযায়ী ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে সারা দেশে ২০০টি সরকারি কলেজে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। তবে বিজ্ঞানশিক্ষার পরিধি বাড়ানো মূল লক্ষ্য হলেও এ প্রকল্পে গবেষণাগারের সরঞ্জামাদির জন্য রাখা হয়েছে কেবল ২০ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের দশমিক ৭৮ শতাংশ। বাকি বরাদ্দের প্রায় পুরোটাই ব্যয় হচ্ছে কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা সম্প্রসারণে। 

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, দেশের ২০০টি সরকারি কলেজে মোট ১ হাজার ২০০টি গবেষণাগারের জন্য সরঞ্জাম কেনা হবে প্রকল্পটির আওতায়। এর মধ্যে ২০০টি পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাগারের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। একই পরিমাণ করে রসায়ন গবেষণাগারের জন্য ৪ কোটি, গণিত গবেষণাগারের জন্য ১ কোটি ৪০ লাখ, প্রাণিবিজ্ঞান গবেষণাগারের জন্য ২ কোটি ৮০ লাখ ও উদ্ভিদবিজ্ঞান গবেষণাগারের জন্য ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া ২০০টি কলেজে কৃষি, ভূগোল, পরিসংখ্যান, খাদ্য ও পুষ্টি, মৃত্তিকাবিজ্ঞানের যেকোনো একটির গবেষণাগার নির্মাণ বা সরঞ্জাম কেনার জন্য বাজেট রাখা হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। সে অনুযায়ী প্রতিটি পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাগারের জন্য মাত্র ৩ লাখ ৭০ হাজার, রসায়নে ২ লাখ, উদ্ভিদবিজ্ঞানে ১ লাখ ৬০ হাজার, জীববিজ্ঞানে ১ লাখ ৪০ হাজার ও গণিত গবেষণাগারের জন্য কেবল ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ। 

কলেজ শিক্ষকরা অবশ্য বলছেন, সিলেবাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ বিজ্ঞানের বিষয়ভেদে একেকটি গবেষণাগারের সরঞ্জাম কেনার জন্য ন্যূনতম ১০ থেকে ৫০ লাখ টাকা লাগে। ফলে সরকারি প্রকল্পটিতে এ খাতে যে বাজেট রাখা হয়েছে তা দিয়ে কোনোভাবেই মানসম্মত গবেষণাগার নির্মাণ সম্ভব নয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির চেয়ারম্যান ড. আবুল কালাম আজাদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিজ্ঞানশিক্ষার মূল বিষয়ই হলো হাতে-কলমে শিক্ষা। এর জন্য ল্যাব অপরিহার্য। তাই বিজ্ঞানশিক্ষা সম্প্রসারণের জন্য জরুরি পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা। অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের চেয়ে এটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ 

প্রকল্পের বরাদ্দ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের এ ইমেরিটাস অধ্যাপক বলেন, ‘বিজ্ঞানশিক্ষা সম্প্রসারণে আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে যদি মাত্র ২০ কোটি টাকা ল্যাব সরঞ্জামের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়, সেটি কখনই কাম্য নয়। কেননা ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত না করে বিজ্ঞানশিক্ষা কতটুকু কার্যকর হবে সে বিষয়েও শঙ্কা থেকে যায়। তাই মানসম্মত ল্যাব নিশ্চিতের জন্য এ খাতের বরাদ্দ আরো কয়েক গুণ বাড়ানো প্রয়োজন ছিল।’

বিজ্ঞানশিক্ষা সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে গবেষণাগার ছাড়াও ১৭৬টি ছয়তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি ১৮টি ঊর্ধ্বমুখী ভবন সম্প্রসারণ, ছয়টি শ্রেণীকক্ষ মেরামত বা সংস্কার, ৪৭টি হোস্টেল ভবন নির্মাণ, ১০টি নতুন বিষয় চালু করা, কম্পিউটার সামগ্রী, বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতি ও আসবাব সরবরাহ, শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ২০০ কলেজে অফিস সরঞ্জাম সরবরাহের কথা বলা হয়। তবে প্রকল্পটির ব্যয় বিভাজন অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে আবাসিক ভবন ও হোস্টেল নির্মাণে, ১ হাজার ৯০৬ কোটি টাকারও বেশি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৪৯ কোটি ১৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা রাখা হয়েছে আসবাব কেনা বাবদ। ভবনের জন্য ১৭৬টি লিফট কিনতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬৬ কোটি ৮৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। গবেষণাগারের জন্য বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম কেনার জন্য বরাদ্দ কেবল ২০ কোটি টাকা। 

এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি কলেজে ভবন ও হোস্টেল নির্মাণ, গবেষণাগার প্রস্তুত করা হয়েছে। তারই একটি নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর সরকারি কলেজ। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে আগে কেবল তিনটি শ্রেণীকক্ষ ও তিনটি গবেষণাগার ছিল। বিজ্ঞানশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কলেজটিতে ১৩টি শ্রেণীকক্ষ ও পাঁচটি গবেষণাগারে পাঠদানের সুযোগসংবলিত একটি বিজ্ঞান ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি সেটি কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞান বিভাগের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী মোস্তাকিম বিল্লাহ, ফুয়াদ হাসান ও আইয়ুব আলী অবশ্য জানান, ওই ভবনের কিছু শ্রেণীকক্ষ ব্যবহার হলেও এখনো পুরো ভবন চালু হয়নি। তাও ব্যবহার করছেন স্নাতকের শিক্ষার্থীরা। 

নজিপুর সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ লোকনুজ্জামান আহম্মেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পে ঠিক কতটুকু কাজ করার কথা, সে-সংক্রান্ত কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে যতটুকু কাজ ঠিকাদার করেছে তার মান ভালো। বিজ্ঞানশিক্ষার উন্নয়নে নতুন এ ভবন আগামীতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। গবেষণাগারের জন্য বরাদ্দটা অবশ্য অনেক কম ছিল।’ 

সরকারি একটি কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গ্রামের কলেজগুলোর বেশির ভাগ ল্যাবসামগ্রীই পুরনো ও ব্যবহার অনুপযোগী। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে পড়াতে হলে ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান সিলেবাসে শিক্ষার্থীদের এমন কিছু বিষয় পড়ানো হয় যেগুলো হাতে-কলমে দেখাতে চাইলে অনেক সরঞ্জাম ও কেমিক্যাল প্রয়োজন, যার দাম লক্ষাধিক টাকা। ফলে বইয়ের পাঠেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। বিজ্ঞানশিক্ষা বিকাশের জন্য নতুন কোনো প্রকল্প নেয়া হলে শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিতে ভালো বরাদ্দ দেয়া উচিত। 

সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিষয়ে নতুন করে ১০টি বিভাগ চালু করার কথাও প্রকল্পটির উদ্দেশ্যে উল্লেখ করা হয়। সেগুলো হলো আইসিটি, পরিবেশবিজ্ঞান, মৎস্যবিজ্ঞান, ফুড প্রসেসিং, টেক্সটাইল অ্যান্ড ফ্যাশন ডিজাইনিং, ফার্মিং টেকনোলজি, ডাটা অ্যানালিটিক, ডিজিটাল মার্কেটিং, ফার্নিচার ডিজাইন অ্যান্ড মেকিং ও কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন। তবে এসব বিভাগের গবেষণাগার তৈরির জন্য কোনো বরাদ্দই রাখা হয়নি প্রকল্পে। 

গবেষণাগারে বরাদ্দের অপ্রতুলতার কথা স্বীকার করে প্রকল্পটির প্রকল্প পরিচালক ড. খন্দকার মুজাহিদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ল্যাবের জন্য যা বরাদ্দ আছে তা পর্যাপ্ত নয়। আসলে ডিপিপি তো আর আমরা তৈরি করিনি। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর এ খাতে বরাদ্দ ১২ কোটি থেকে বাড়িয়ে ২০ কোটি টাকা করেছি। তবে এ খাতে যদি আরো কয়েক গুণ বরাদ্দ বাড়ানো যেত তাহলে সন্তোষজনক ল্যাব তৈরি করা যেত। ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আবার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।’ 

গবেষণাগার ছাড়াই নতুন বিভাগ চালুর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০০ কলেজের প্রতিটিতে ১০টি বিভাগ চালু হবে এমন নয়। এলাকাভিত্তিক চাহিদা বিবেচনা করে কলেজগুলোয় এক বা একাধিক বিভাগ চালু করা হবে। মূলত প্রকল্পের নতুন বিভাগ চালুর সুযোগ তৈরির বিষয়ে বলা হয়েছে। এর জন্য শিক্ষকের পদ সৃজনের প্রস্তাব দেয়া হবে। এ বিষয়ে কাজ চলছে। এসব বিভাগের কার্যক্রম যখন শুরু করা হবে তখন ল্যাবের জন্য নতুন বরাদ্দ দেয়া হবে।’

শিক্ষা খাতের প্রকল্পগুলোয় যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক ব্যয় বিভাজন হয় না। এর জন্য শিক্ষা খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নও হয় না বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। সার্বিক বিষয়ে অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের প্রকল্পগুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে গুণগত মান নিশ্চিত করা হয় না। মূল্য বেশি দেখানো হয় এবং ঠিকাদারসহ সংশ্লিষ্ট একটি অংশই মূলত লাভবান হয়। শিক্ষার উন্নয়ন করতে হলে অবশ্যই প্রকল্পের আগে প্রকৃত চাহিদা ও প্রয়োজন নিরূপণ করতে হবে এবং সে অনুযায়ী বরাদ্দ দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে মানসম্মত কাজ।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দেশের বেশির ভাগ কলেজে ল্যাব সরঞ্জাম নষ্ট, প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল ও পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। বিজ্ঞানশিক্ষার উন্নয়ন করতে চাইলে অবশ্যই প্রতিটি কলেজের ল্যাবের অবস্থা জেনে সে অনুযায়ী বরাদ্দ দিতে হবে। একই সঙ্গে এসব কলেজে নিয়োগ দিতে হবে পর্যাপ্ত শিক্ষক। শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত না করে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে তো আর শিক্ষার উন্নয়ন হবে না।’

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নওগাঁ প্রতিনিধি আরমান হোসেন রুমন)