দুর্গম এলাকা হওয়ায় এক্সপ্রেসওয়েটির জন্য বিপুলসংখ্যক ছোট-বড় সেতু এবং পাহাড় কেটে টানেল বানাতে হয়েছে। দুর্গম পাহাড় আর উপত্যকাঘেরা এলাকার পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ঝুঁকি এক্সপ্রেসওয়েটিকে চীনের ব্যয়বহুল মহাসড়কে পরিণত করেছে। এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছে ২০০ মিলিয়ন ইউয়ান, বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী যা ৩৬৫ কোটি টাকার সমপরিমাণ।

বাংলাদেশী মুদ্রায় কিলোমিটারপ্রতি ৬৩০ কোটি টাকা খরচ করে দামনসারা-শাহ আলম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (ড্যাশ) নির্মাণ করেছে মালয়েশিয়া। এ উড়ালসড়ক আধুনিক অবকাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের জন্য বিশেষভাবে আলোচিত। যানবাহন চলাচল ও নিয়ন্ত্রণের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ছাড়াও এতে সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, নয়েজ ব্যারিয়ারের মতো সুবিধা গড়ে তোলা হয়েছে। মাল্টি-লেন ফ্রি ফ্লো (এমএলএফএফ) টোল ব্যবস্থার সঙ্গে ১৩টি ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণ করা হয়েছে এ এক্সপ্রেসওয়েতে।

ভারতের প্রথম আট লেনের এলিভেটেড মহাসড়ক দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়ে। কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) অব ইন্ডিয়ার হিসাব অনুযায়ী, এক্সপ্রেসওয়েটির প্রতি কিলোমিটারের নির্মাণ ব্যয় ২৫০ কোটি রুপি, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৩২০ কোটি টাকা। প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য বিমানবন্দরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। এ সুবিধা নিশ্চিত করতে নির্মিত হয়েছে ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আট লেনের সুড়ঙ্গ, যা ভারতের অন্যতম প্রশস্ত নগর (আরবান) টানেল হিসেবে বিবেচিত।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করছে বাংলাদেশও। দেশের প্রথম ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ নির্মাণ করা হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) পদ্ধতিতে। অন্যদিকে বিদেশী ঋণে নির্মিত হচ্ছে দেশের দ্বিতীয় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ‘ঢাকা-আশুলিয়া’। ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এ উড়ালসড়কের নির্মাণ ব্যয় ২৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ব্যয়ের দিক দিয়ে এটি বিশ্বে অন্যতম শীর্ষে। এ প্রকল্পের ডিপিপি পাস হয় ২০১৭ সালে। ঠিকাদারের সঙ্গে চায়না কমার্শিয়াল লোনের চুক্তি হয়েছে ২০২২ সালের মাঝামাঝিতে। এরপর শুরু হয় নির্মাণকাজ।

কিলোমিটারপ্রতি ৮৩৭ কোটি টাকা খরচে পোর্ট অ্যাকসেস এলিভেটেড হাইওয়ে নির্মাণ করছে শ্রীলংকা। কিলোমিটারপ্রতি ৩৯০ কোটি টাকায় শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ স্কাইওয়ে নির্মাণ করেছে ইন্দোনেশিয়া। রামা ৩ এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করেছে থাইল্যান্ড কিলোমিটারপ্রতি ৬১২ কোটি টাকা ব্যয়ে। এ প্রকল্পগুলোর অবকাঠামোগত সুবিধা চীন, মালয়েশিয়ায় নির্মিত এক্সপ্রেসওয়েগুলোর মতোই।

ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের আওতায় ২৪ কিলোমিটার উড়ালপথ, প্রায় ১১ কিলোমিটার র‍্যাম্প, দুই লেনের নবীনগর ফ্লাইওভার, বাইপাইলে ট্রাম্পেট ইন্টারচেঞ্জ, ১৪ কিলোমিটার অ্যাট-গ্রেড সড়ক পুনর্নির্মাণ, দুই লেনের সেতু, ওভারপাস ও ফ্লাইওভার, আধুনিক ড্রেনেজ ও ইউটিলিটি ডাক্ট এবং টোল প্লাজা নির্মাণ করা হচ্ছে।

inside-lead.jpg

যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ব্যয়ের দিক দিয়ে বিশ্বে অন্যতম শীর্ষ হলেও এর অবকাঠামোগত সুবিধা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশে মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ব্যয় অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় বেশি হলেও সেই ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নির্মাণমান, পরিবেশগত সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। উন্নত ও উদীয়মান দেশগুলো অবকাঠামো নির্মাণে শুধু মূল নির্মাণ ব্যয় নয়, পরিবেশগত শর্ত পূরণ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তাকেও প্রকল্পের মূল বাজেটের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু বাংলাদেশে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা হলেও বাস্তবায়নের সময় তার কার্যকর প্রয়োগ ও তদারকির ঘাটতি রয়ে যায়। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও আমরা এমন অবকাঠামো পাচ্ছি, যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।’

ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্পের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অনেক আধুনিক মেট্রোরেল ব্যবস্থায় ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ, জ্বালানি দক্ষতা ও অন্যান্য অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি নকশাতেই বিবেচনায় নেয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে ভবিষ্যৎ চাহিদার বিষয়টি পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। তাই শুধু প্রতি কিলোমিটার নির্মাণ ব্যয়ের তুলনা করলেই প্রকল্পের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না; বরং সেই ব্যয়ের বিপরীতে কী ধরনের প্রকৌশলগত মান, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়েছে, সেটিও মূল্যায়নের মানদণ্ড হওয়া উচিত।’

ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় এর প্রস্তাবিত ব্যয় ছিল ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বেড়ে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। সর্বশেষ দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব একনেকে অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকল্পটির মোট ব্যয় আরো বেড়ে প্রায় ২৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত ২২ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন হয়।

বিপুল ব্যয়ে নির্মিত হলেও ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে কারিগরি ও আর্থিকভাবে লাভজনক হওয়ার বিষয়ে অসংগতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এক্সপ্রেসওয়ে কোনো অলাভজনক সামাজিক সেবা খাত নয়, এটিকে অবশ্যই “ফাইন্যান্সিয়ালি ভায়াবল” বা আর্থিক দিক থেকে লাভজনক হতে হয়। প্রাথমিক সমীক্ষায় নিশ্চয়ই এটিকে লাভজনক দেখানো হয়েছিল। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য একই থাকা সত্ত্বেও যদি একই প্রকল্পে অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা যুক্ত হয়, তবে এর ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টারনাল রেট অব রিটার্নসহ অন্যান্য আর্থিক সূচক ভেঙে পড়ার কথা। ডিজাইন ও বাস্তবায়ন একই ঠিকাদারের হাতে থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে ড্রেনেজ বা ইউটিলিটি স্থানান্তরের অজুহাতে জমি অধিগ্রহণ ও ব্যয় বৃদ্ধি প্রাথমিক পরিকল্পনার চরম ঘাটতিকেই স্পষ্ট করে। ফলে অতিরিক্ত এ বিপুল ব্যয় যুক্ত হওয়ার পর প্রকল্পটি আদৌ ফাইন্যান্সিয়ালি ভায়াবল থাকছে কিনা তা মূল্যায়ন করতে এখনই নিরপেক্ষ “‍পোস্ট-ইভ্যালুয়েশন” বা বাস্তবায়নোত্তর অ্যাসেসমেন্ট করা জরুরি।’

নির্মাণ ব্যয় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুললেও প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ব্যয় যৌক্তিক কারণেই বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পটির ব্যয় শুধু একটি কারণে বাড়েনি। ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, ভ্যাট-ট্যাক্স ও কাস্টমস শুল্ক বৃদ্ধি, আগে ডিপিপিতে না থাকা ইউটিলিটি স্থানান্তর, রেলওয়ে ও বিআইডব্লিউটিএর চাহিদা অনুযায়ী নকশা পরিবর্তন, নৌযান চলাচলের শ্রেণী পরিবর্তন এবং বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, মেট্রোরেল ও পাতালরেলের সঙ্গে সংযুক্ত করার কারণে ব্যয় বেড়েছে।’

একই ধরনের মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা কমিশনের সচিব এসএম শাকিল আখতার। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে নির্মাণকাজ, প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী আমদানি, নতুন সংযোগপথ যুক্ত করা এবং বিদ্যমান ফ্লাইওভারের কারণে অনেক স্থানে আরো উঁচু পিলার নির্মাণের প্রয়োজন হওয়ায় ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।’

নির্মাণকাজের প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে হঠাৎ সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার বড় অংকের ব্যয় বৃদ্ধি বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বণিক বার্তার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করেননি।

এর আগে ব্যয় বাড়ার কারণ হিসেবে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম একনেক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তন, ভ্যাট ও করের হিসাবের পরিবর্তন, মূল ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত না থাকা ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর এবং নতুন পাঁচটি উপাদান সংযোজনের কারণেই ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।’

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এ প্রকল্পে প্রথম থেকে যথাযথ পরিকল্পনার অভাব দেখছেন। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক বিভিন্ন সমীক্ষায় আমরা দেখেছি সব অবকাঠামো, পরিবহন খাতের নির্মাণে অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের এখানে ব্যয় বেশি হয়। ঢাকা-আশুলিয়া প্রকল্পে শুরুতে নকশা নিয়ে জটিলতা ছিল। পরে সেটা যখন পরিবর্তন হলো তখন ব্যয় বেড়েছে। সে কারণে বলছি, আমাদের প্রথম থেকে পরিকল্পনায় ঘাটতি থাকে। ফলে প্রকল্প শেষে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। আবার অন্য দেশের তুলনায় আমাদের ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয়, সামগ্রী আমদানি ও ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকে। সে জায়গা থেকে বের হয়ে আসতে হলে একটি তুলনামূলক স্টাডি থাকতে হবে এবং অনুসন্ধান করতে হবে কোন খাতে ব্যয় বাড়ে এবং কেন বাড়ে। সেগুলো শনাক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে নির্মাণ ব্যয় কমিয়ে আনা যাবে।’