বাংলাদেশ রেলওয়ের ১৯৮৫ সালের নিয়োগ বিধি বাতিল হয় গত বছর। এর পর থেকেই সংস্থাটির সব ধরনের নিয়োগ স্থগিত রয়েছে। অন্যদিকে পরিচালন কার্যক্রমে লোকবল সংকট হয়েছে তীব্র থেকে তীব্রতর। বিকল্প অস্থায়ী নিয়োগ পদ্ধতি টিএলআর (কাজ নেই, মজুরি নেই) নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। স্থানীয় কার্যালয় প্রধান ও অর্থ বিভাগের অনুমোদনক্রমে টিএলআর নিয়োগের নিয়ম থাকলেও বর্তমানে রেল প্রশাসনের আপত্তিতে আটকে রয়েছে এ ধরনের একাধিক নিয়োজন প্রক্রিয়া। এতে রেলের পরিচালন কার্যক্রমে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
সম্প্রতি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ও অর্থ বিভাগের প্রধানের অনুমোদন সাপেক্ষে ৪৫ জন টিএলআর পি-ম্যান (পয়েন্টস ম্যান) নিয়োগ দেন বিভাগীয় ট্রাফিক অফিসার (ডিটিও) মো. ওমর ফারুক। ওই সময় পূর্বাঞ্চল রেলের দুটি বিভাগ ঢাকা ও চট্টগ্রামের জন্য মোট ১০০ জন পি-ম্যান নিয়োগের অনুমোদন দেয়া হয়। কয়েক বছর ধরে একাধিকবার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৩ মার্চ ঢাকা বিভাগে ৫৫ জন ও চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৫ জন পি-ম্যান নিয়োগের অনুমোদন দেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক। এরপর ১৮ মে ৪৫ জন পি-ম্যান নিয়োগ দেয় পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন বিভাগ (চট্টগ্রাম)। তাদের পদায়ন করা হয় চট্টগ্রাম বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন ও স্টেশন সংলগ্ন মেইল লাইন ও বন্ধ থাকা স্টেশনে।
চট্টগ্রাম বিভাগ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তাবিত পি-ম্যানদের নিয়োগ দিতে সক্ষম হলেও ঢাকা বিভাগের ৫৫ জনকে এখনো নিয়োগ করা যায়নি। অতীতে একাধিকবার যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে পয়েন্টস ম্যান, গেটকিপারসহ বিভিন্ন শূন্য পদ পূরণ করা হলেও সম্প্রতি টিএলআর নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রেলওয়ে মহাপরিচালকের কার্যালয়। টিএলআর নিয়োগে স্থানীয় প্রশাসনের কোনো বৈধ এখতিয়ার নেই বলে মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে। এতে আগে থেকেই জনবল সংকটে ভুগতে থাকা রেলওয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন করে অস্থায়ী নিয়োগও বন্ধ হতে বসেছে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৫ জন পয়েন্টস ম্যান নিয়োগের পর টিএলআর নিয়োগে রেলভবনের অনুমোদন না নেয়ার কারণ জানতে চেয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের উপপরিচালক (ট্রাফিক ট্রান্সপোর্টেশন) কালিকান্ত ঘোষ স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে নিয়োগ বিধি বাতিল সত্ত্বেও পয়েন্টস ম্যান নিয়োগ ও তাতে মহাপরিচালকের অনুমোদন না নেয়ার বিষয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। যদিও রেলওয়ের ১৯৮৫ সালের নিয়োগ বিধি চালু থাকা অবস্থায়ও সংকটকালে নিয়োগ আটকে থাকা চতুর্থ শ্রেণীর বিভিন্ন শূন্য পদে (অস্থায়ী) টিএলআর নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনেও টিএলআর নিয়োজনের ক্ষেত্রে স্থানীয় দপ্তরের সিদ্ধান্ত নেয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
২০০৩ সালের ১৪ জুন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জারীকৃত এ-সংক্রান্ত এক পরিপত্রে ‘কাজ নেই, মজুরি নেই’-এর ভিত্তিতে নিয়োজিত জনবলের সুবিধাবলিসংক্রান্ত নীতিমালায় দেখা গেছে, টিএলআর নিয়োগের ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ, টিএলআরদের বয়সসীমা, নিয়োজন পদ্ধতি, মজুরি বৃদ্ধির সুবিধা নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে স্থানীয় দপ্তরের। এক্ষেত্রে নিয়োজিতদের জন্য বেশকিছু শর্ত পরিপালনের নির্দেশনা রয়েছে।
কিন্তু বিষয়টি নিয়ে হঠাৎ করেই রেলওয়ে মহাপরিচালকের কার্যালয়ের আপত্তির কারণে পূর্বাঞ্চলের ঢাকা বিভাগের ৫৫ জন পয়েন্টস ম্যানসহ বিভিন্ন দপ্তরে টিএলআর নিয়োজন আটকে গেছে। এতে ট্রেন পরিচালনা চরম বিঘ্নিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে রেলের পরিবহন বিভাগ।
টিএলআর নিয়োজন নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই দাবি করে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (সিওপিএস) এএমএম শাহনেওয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, রেলের দুটি অঞ্চল প্রধানের ক্ষমতা রয়েছে টিএলআর নিয়োগের। রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের বৈঠকে জনবল সংকটের বিষয়টি উত্থাপন করা হলে অনুমতিও দেয়া হয়েছে একাধিকবার। নিয়োগ বিধি চালু থাকা অবস্থায়ও রেল পরিচালনার স্বার্থে টিএলআর নিয়োগ হয়েছে। ফলে বর্তমানে টিএলআর নিয়োগের বিষয়ে অনাপত্তির কোনো সুযোগ নেই। সুষ্ঠুভাবে ট্রেন পরিচালনার স্বার্থে সরকারের প্রজ্ঞাপন অনুসরণ করে প্রয়োজন হলে ‘কাজ নেই, মজুরি নেই’-এর ভিত্তিতে সম্পূর্ণ অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ দেবে রেলওয়ে।
রেলের নিয়োগসংক্রান্ত একাধিক নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিয়োগ স্থগিত থাকা কিংবা মামলাসহ বিভিন্ন জটিলতায় আটকে থাকা পদে রেলওয়ের উভয় অঞ্চলের বিভিন্ন বিভাগে টিএলআর নিয়োগের একাধিক নজির রয়েছে। ২০১৯ সালের ৪ ডিসেম্বর সুষ্ঠু, নিরাপদ ও সময়ানুবর্তিতার সঙ্গে ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করার স্বার্থে ও বন্ধ স্টেশনগুলো চালু করার নিমিত্তে পরিবহন বিভাগে ৬৬ জন অস্থায়ী পয়েন্টস ম্যান নিয়োগ দেয়ার অনুমোদন দিয়েছিলেন পশ্চিমাঞ্চল রেলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মো. শহিদুল ইসলাম। জনপ্রতি দৈনিক ৪০০ টাকা মজুরির বিনিময়ে এবং অর্থনৈতিক কোড-৩২১১১৩৪-এর বিপরীতে এক বছরের জন্য এ পয়েন্টস ম্যানদের নিয়োগ দেন পশ্চিম রেলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (পাকশী)।
জানা গিয়েছে, এক সময় বাংলাদেশ রেলওয়েতে মোট জনবল ছিল প্রায় ৪০ হাজার। কিন্তু নানা কারণে রেলের নিয়োগ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় লোকবল কমতে কমতে ২৫ হাজারে নেমে আসে। তবে গত এক দশক ধরে রেলের কার্যক্রম বাড়ানো হলেও ধীর লোকবল নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে সংকটে পড়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। এ কারণে বিভিন্ন মাঠ পর্যায়ের কাজে টিএলআর নিয়োগের মাধ্যমে জটিলতা নিরসন করে আসছে রেল কর্তৃপক্ষ। গত কয়েক বছরে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগেও একাধিক টিএলআর নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে। এক্ষেত্রে সংকট কাটাতে দ্রুত নিয়োগ বিধি সংশোধন করে আটকে থাকা জনবল নিয়োগের দাবি তুলেছেন রেলওয়ের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, রেলওয়ে রিক্রুটমেন্ট রুলস-১৯৮৫ বাতিল হলেও সেটি সংশোধনের মাধ্যমে রেলওয়ের সংকট মেটাতে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বিধি সংশোধনে একটি কমিটি করা হলেও, সেটি কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। রেলওয়ে একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রকৌশলগত খাত হওয়ায় মাঠ পর্যায়ের সহযোগী দক্ষ কর্মী ছাড়া ট্রেন পরিচালনা অসম্ভব। সরকারি বিধিবিধান মেনে স্থানীয় প্রশাসন ‘কাজ নেই, মজুরি নেই’-এর ভিত্তিতে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী নিয়োগ দিতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সারা দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানে টিএলআর নিয়োজনের প্রজ্ঞাপনও রয়েছে। বিধিবদ্ধভাবে টিএলআর নিয়োগে রেলভবন থেকে হস্তক্ষেপ করা হলে রেলের অপারেশনাল কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া যে পদে টিএলআর পদ্ধতি অনুসরণ নিয়ে আপত্তি উঠেছে, পরিচালন কার্যক্রমের জন্য সেটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ রেলওয়ের পি-ম্যান সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ আছে, বি-ক্লাস স্টেশনে পি-ম্যান ঘাটতির কারণে স্টেশনটির সব ধরনের অপারেটিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া স্টেশনের ক্রসিং ট্রেন পাইলটিং সান্টিং কার্যক্রম ব্যাহত হবে, ট্রেন ফরমেশন বন্ধ হবে, ফেইলিউরজনিত কারণে ট্রেন পরিচালনা ব্যাহত হবে, নন-ইন্টারলকিং স্টেশনের ট্রেন ক্রসিং বন্ধ হবে, কোনো স্টেশনের উভয় পাশের স্টেশনে ব্লক ফেইলিউর থাকলে পিএলসি ইস্যু করা যাবে না। তাছাড়া কোনো ডাবল লাইন সেকশনে সিঙ্গেল লাইন অপারেশনে ট্রেন পরিচালনার নির্দেশনা দেয়া হলে, পয়েন্টস ম্যানের অভাবে অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ইমার্জেন্সি হ্যান্ডেল দ্বারা পয়েন্ট অপারেশন কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
পূর্বাঞ্চলের পরিবহন বিভাগের তথ্যমতে, পূর্বাঞ্চলে অত্যাবশ্যকীয় ক্যাটাগরিতে তীব্র লোকবল ঘাটতি রয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের ৩৫০টি মঞ্জুরীকৃত পদের বিপরীতে জনবল ঘাটতি রয়েছে ১৮০টি পদের। এর মধ্যে ২৭৬টি পয়েন্টস ম্যান পদের ১১৮টি শূন্য রয়েছে। পয়েন্টস ম্যানদের পদোন্নতির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের জন্য ২০১৭ সাল থেকেই তাগাদা দিয়ে আসছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু মামলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি পয়েন্টস ম্যান নিয়োগ বন্ধ থাকার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে নিয়োগ বিধি বাতিলের কারণে এ সংকট আরো তীব্র হয়েছে।









