দেশে হামের প্রকোপের মধ্যেই দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু। চলতি বছর ডেঙ্গুতে প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ১০২ জনে। অন্যদিকে গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৭৯। গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) দুই রোগে আরো ১১ জন মারা গেছে। এর মধ্যে ডেঙ্গুতে পাঁচজন এবং হাম ও হামের উপসর্গে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৩২৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৯ হাজার ২০৬ জন। আগস্টে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫৩৬-এ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। চলতি বছরের মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি শনাক্ত হয়েছে শুধু আগস্টে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু ও হাম মোকাবেলায় জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। চিকিৎসাসেবা শুধু বড় হাসপাতালকেন্দ্রিক না রেখে কমিউনিটি ও প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করতে হবে। উপজেলা ও স্থানীয় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং বিনামূল্যে পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো গেলে অধিকাংশ রোগী সেখানেই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে। হামের টিকাদানের লক্ষ্য নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে ৫-১৫ বছর বয়সী টিকাবঞ্চিত শিশুদের টিকা দেয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে আগস্টে ডেঙ্গুতে প্রাণহানিও বেড়েছে। চলতি বছর এ রোগে মারা যাওয়া ১০২ জনের মধ্যে আগস্টেই মৃত্যু হয়েছে ৪৩ জনের। এর আগে জুলাইয়ে মারা গিয়েছিল ৩৬ জন। আর চলতি মাসের প্রথম দিনেই পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ পরিসংখ্যান বলছে, বর্ষার শেষভাগে ডেঙ্গুর সংক্রমণের পাশাপাশি মৃত্যুও বাড়ছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এরপর খুলনায় ১৮, ময়মনসিংহে ১০, বরিশালে নয়, চট্টগ্রামে সাত, রাজশাহীতে চার এবং রংপুর ও সিলেট বিভাগে একজন করে মারা গেছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, সরকারের প্রধান সীমাবদ্ধতা হচ্ছে ডেঙ্গু ও হামকে জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে মোকাবেলা না করা। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গতানুগতিকভাবে হাসপাতালে আইসিইউ বাড়ানো এবং ডাক্তার-নার্স ঢাকায় এনে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করলে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে সমন্বিত সহযোগিতা নেয়া সম্ভব হতো।’
চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা শুধু বড় হাসপাতালকেন্দ্রিক না করে কমিউনিটি পর্যায় থেকে শুরু করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে অধিকাংশ রোগী সেখানেই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে। এতে জটিল রোগীর সংখ্যা ও হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে।’
হামের টিকাদান নিয়েও মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা ঠিক ছিল। তবে পরে মাঠপর্যায়ে টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত করে টিকা দেয়ার কাজ করা হয়নি। এখন পাঁচ থেকে ১৫ বছর বয়সী যেসব শিশু হামে আক্রান্ত হয়নি, তাদের টিকা দেয়া উচিত। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় যে ব্যয় হবে, তা আইসিইউ বাড়ানোর ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম।’ তার মতে, ডেঙ্গু নভেম্বর পর্যন্ত বাড়তেই থাকবে। এরপর কিছুটা কমে আবার ফেব্রুয়ারির দিকে শুরু হবে। অর্থাৎ সারা বছরই ডেঙ্গু থাকছে।
এদিকে হামের প্রকোপও এখনো অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল আটটা থেকে গতকাল সকাল আটটা) হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৭৯। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ছয়জনের মধ্যে দুজন ঢাকা, দুজন বরিশাল ও দুজন সিলেট বিভাগের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৮৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৯৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ১৫৯ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। একই সময়ে ৭২ জনের শরীরে হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৫০। নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৩৮৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. জাহিদ রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হামে মৃত্যু ধীরে ধীরে কমে আসছে। হার্ড ইমিউনিটি তৈরি না হলে আক্রান্ত ও মৃত্যু একেবারে বন্ধ করা সম্ভব নয়। আমরা তবু চেষ্টা চালাচ্ছি। পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিলেও তা আগের বছরের তুলনায় অনেক কম। মৃত্যুহারও কমেছে। হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক। আমাদের পর্যাপ্ত রিসোর্স নেই, তবু আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি।’










