কিন্তু এত অর্থ জোগান দেয়া তার পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। রায়হানের মা আঁখি আক্তার জানান, ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে তারা প্রায় নিঃস্ব। আত্মীয়-স্বজনের কাছেও ধারদেনা হয়ে গেছে। সম্প্রতি সমাজসেবা অধিদপ্তরের চিকিৎসা সহায়তা প্রকল্পের বিষয়ে জানতে পেরেছেন। তাই এখন সহায়তার জন্য আবেদন করার কথা ভাবছেন তারা।
দেশে প্রতি বছর কয়েক লাখ মানুষ ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোক, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। এসব রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল বলে সরকার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে রোগীদের এককালীন ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়ার প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পের নাম ‘ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি’। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় এটি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চালু হয়।
এ আর্থিক সহায়তা কার্যক্রমে ক্যান্সার রোগীদের আবেদনের সংখ্যা বাড়ছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ছয় ধরনের জটিল রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা সহায়তায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। এ বরাদ্দের বড় অংশ পেয়েছে ক্যান্সারে আক্রান্তরা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, প্রতি দুটি আবেদনের অন্তত একটি ক্যান্সার আক্রান্তের।
ক্যান্সারের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল। সাধারণ পরিবারের পক্ষে এ ব্যয় মেটানো কঠিন। ফলে অন্য রোগের তুলনায় ক্যান্সারে আক্রান্তদের চিকিৎসা সহায়তার আবেদন বেশি আসে। সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অন্য পাঁচ ধরনের রোগের তুলনায় ক্যান্সার রোগীদের সরকারি সহায়তার প্রয়োজন বেশি।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্য বলছে, বিভাগের ১১টি জেলায় আলোচ্য ছয় রোগে আক্রান্তদের সহায়তায় সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। তবে অর্থবছর শেষ হলেও চতুর্থ কিস্তির টাকা দেরিতে আসায় মোট ৬ হাজার ২৯৮ জন উপকারভোগীকে এখন পর্যন্ত ৩১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। চতুর্থ কিস্তির ১৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা বিতরণে আবেদন যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হাসপাতালটিতে প্রায় ২৮ হাজার নতুন ও পুরনো ক্যান্সার রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে পুরনো রোগী প্রায় সাড়ে ২১ হাজার এবং নতুন ক্যান্সারে শনাক্ত হওয়া রোগী ৬ হাজার ৩০০ জন। নতুন ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে পুরুষ রোগী প্রায় সাড়ে তিন হাজার এবং নারীর সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৮০০।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. তৌহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার প্রতি বছর ছয়টি বিশেষ রোগে আক্রান্ত মানুষের সহায়তায় বাজেট দেয়। সঠিক কাগজপত্র জমা দেয়া সাপেক্ষে রোগীপ্রতি ৫০ হাজার টাকা অর্থসহায়তা দেয়া হয়। যারা আমাদের এখানে আবেদন করছেন, তাদের বেশির ভাগই ক্যান্সারে আক্রান্ত। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও ওষুধের ব্যয় বেশি হওয়ায় ক্যান্সার রোগীদের আবেদন বেশি আসে।’
জেলাভিত্তিক উপকারভোগীদের সংখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম জেলায় ১ হাজার ৮৭৩ জন, কক্সবাজারে ৩৮৪, রাঙ্গামাটিতে ১৩২, বান্দরবানে ৯৯, খাগড়াছড়িতে ১৪৬, ফেনীতে ২২৪, লক্ষ্মীপুরে ৩৯৬, নোয়াখালীতে ৭৪১, কুমিল্লায় ১ হাজার ২৬৯, চাঁদপুরে ৩৬০ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ৬৭৪ জন রোগী সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে সব জেলায় তিন কিস্তির টাকা বিতরণ সম্পন্ন হলেও চাঁদপুরে এখন পর্যন্ত দুই কিস্তির টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক মো. শহীদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ অঞ্চলে ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের সহায়তার আবেদন বেশি। অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রেও আবেদন আসে, তবে ক্যান্সারে আক্রান্তদের মতো নয়। এ সহায়তা ৫০ হাজার টাকা হলেও চলতি বছরের ১১ জুন সংসদে বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী তা ১ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেন। যারা টাকার জন্য চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছেন না, এ অর্থ তাদের সহায়তা করবে। তবে নতুন অর্থবছরের বরাদ্দ এখনো অনুমোদন হয়নি। বরাদ্দ অনুমোদনের পর নিয়ম অনুযায়ী আবেদনকারীদের সহায়তা দেয়া হবে।’










